সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ৮ ঘড়ির দাম ৩৭ কোটি টাকা, জবানবন্দিতে আরামিটের ২ কর্মকর্তা
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
দেশ ডেস্ক:: সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের আটটি বিলাসবহুল ঘড়ির মূল্য প্রায় ৩৭ কোটি টাকা। যা তার যুক্তরাজ্যে জমা দেওয়া আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একই তথ্য রয়েছে জাবেদের মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপের ঘনিষ্ঠ দুই কর্মকর্তা মো. আবদুল আজীজ ও উৎপল পালের ল্যাপটপে।
সোমবার আরামিটের দুই কর্মকর্তা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ তথ্য জানান। চট্টগ্রাম মেট্টোপটিলট ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিনের আদালত তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের সম্পদের অনুসন্ধান টিমের প্রধান দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, আরামিট গ্রুপের দুই কর্মকর্তা পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে সোমবার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
জবানবন্দিতে উল্লেখ করা আটটি ঘড়ির ব্র্যান্ড হলো- Patek Philippe, Notelus, Rolex Presidential, Rose Gold, Rolex Daytona, Frank Muller Rose, Ap Royal Oak, Rolex Selini.
সাবেক ভূমিমন্ত্রী ভুয়া ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে মোটা অংকের ঋণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দুবাইসহ ৯টি দেশে পাচার করেছেন। পাচার করা অর্থে তিনি বিপুল সম্পদ ক্রয় করেছেন বলে জানান আরামিটের দুই কর্মকর্তা।
তারা জবানবন্দিতে বলেন, সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভুয়া দশটি প্রতিষ্ঠান হলো- মডেল ট্রেডিং, ক্লাসিক ট্রেডিং, রেডিয়াস ট্রেডিং, লুসেন্ট ট্রেডিং, ইমিনেন্ট ট্রেডিং, প্রগ্রেসিভ ট্রেডিং, ভিশন ট্রেডিং, রিলায়েবল ট্রেডিং, ক্রিসেন্ট ট্রেডার্স ও ইমপেরিয়াল ট্রেডিং। ইউসিবি ব্যাংকের ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন শাখায় (১) মডেল ট্রেডিং স্বত্বাধিকারী মিছাবাহুল আলম (২) ইমিনেন্ট ট্রেডিং- শেখ ফোরকান (৩) প্রগ্রেসিভ ট্রেডিং- জসিম উদ্দিন (৪) ভিশন ট্রেডিং ফরমান উল্লাহ চৌধুরী (৫) রিলায়েবল ট্রেডিং- হোসেন চৌধুরী (৬) ক্রিসেন্ট ট্রেডার্স- নুরুল ইসলাম এদের নামে হিসাব খুলে ওই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে আনুমানিক ১২৫ কোটি টাকা টাইম (ওয়ার্কিং ক্যাপিট্যাল) বাবদ ঋণ অনুমোদন করে এই ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হস্তান্তর করে সাইফুজ্জামান চৌধুরী বিদেশে পাচার করেন।
ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন করিয়ে এবং প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ বাবদ অর্থ পরবর্তীতে নগদ চেকের মাধ্যমে কোম্পানির বাহক কর্তৃক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ক্যাশিয়ারদের কাছে চেক পৌঁছে দিতেন সাইফুজ্জামান। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের হুন্ডিওয়ালা মো. শহীদ (সায়িদ) অথবা জাহিদ কফি আনান, বকতিয়ার কিংবা জিসান মারফত ব্যাংক থেকে টাকা সংগ্রহ করতেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশি টাকার মুদ্রার বিনিময়ে ডলার/পাউন্ড হুন্ডিওয়ালার দুবাই হিসাব থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরী কর্তৃক সরাসরি বৈদেশিক ডেভেলপার বা সলিসিটর এর হিসাব নাম্বারে প্রেরণ করা হতো এবং হন্ডিওয়ালা Telegraphic Transfer (tt) এর মাধ্যমে প্রেরিত হিসাবে কারেন্সি জমা করত এবং জমা স্লিপ/টিটি স্লিপ সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে প্রদান করতো বলে জানান আরামিটের দুই কর্মকর্তা।
তারা জবানবন্দিতে বলেন, বিগত ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে লন্ডনে প্রথমে ফ্ল্যাট ক্রয় করেন যার মূলা ২,১২,৫০০ পাউন্ড। ওই অর্থ সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ব্যক্তিগত হিসাব নং-০৭৯৩২০১০০০০০১৮০৮ বহদ্দার হাট শাখা ইউসিবি ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে নগদে সায়িদ (হুন্ডিওয়ালাকে) প্রেরণ করা হয়েছে অথবা নর্থ ওয়েন্ট সিকিউরিটি লি. এর হিসাব ইউসিবি বহদ্দার হাট শাখা থেকে ওই অর্থ হুন্ডিওয়ালাকে) প্রেরণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে হস্তিওয়ালার দুবাইয়ের হিসাব হতে জনাব সাইফুজ্জামান চৌধুরী সলিসিটরের ব্যাংক হিসাবে প্রেরণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০১৪/ ২০১৫ সালের শুরুতে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর জেবা ট্রেডিং (FZE) নামক একটি বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল বিজনেজ এর নামে দুবাই থেকে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করে পরবর্তীতে ওই লাইসেন্স ব্যবহার করে ডুবাই মাশরেক ব্যাংকে দুটি মাল্টি কারেন্সি হিসাব খোলেন যার একটি নিজ নামে অপরটি জেবা ট্রেডিং এর নামে। পরবর্তীতে হুন্ডির মাধ্যমে জেবা ট্রেডিংয়ের হিসাবে (AED) দেরহাম নগদে এবং চেকের মাধ্যমে জমা করা হতো। পরবর্তীতে সেখান থেকে পাউন্ড/ডলারে কনভার্ট করে সাইফুজ্জামান চৌধুরী সলিসিটরি হিসাবে উনি নিজেই ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে প্রেরণ করতেন।
আরামিটের দুই কর্মকর্তা আরও বলেন, ক্রয়কৃত সম্পদের অর্থ সাইফুজ্জামান চৌধুরী তার কমমূল্যের সংম্পদ ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ করে ওভার ভ্যালুয়েশন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে মোটা অংকের লোন গ্রহণ করে নিজ ও তার নামীয় প্রতিষ্ঠানের নামে যুক্তরাজ্যে ২০ কোটি ৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার প্রতিষ্ঠানের নামে যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি সম্পদ রয়েছে। যার মূল্য ৮০,১৯,০০০ ডলার, ভিয়েতনামে সম্পদের পরিমাণ ৩টি যার মূল্য ২,৪২,০০০ ডলার, ভারতে ৩টি সম্পদ যার মূল্য ২,৯৭,৮৯৩ ডলার, মালয়েশিয়ার সম্পদ ০৮টি যার মূল্য ১৬,৩১,০০০ ডলার, থাইল্যান্ডে ২টি যার মূল্য ১,৫৩,০০০ ডলার, সিঙ্গাপুরে ১টি যার মূল্য ১৬,১২,০০০ সিঙ্গাপুর ডলার, দুবাই সম্পদের সংখ্যা ১২টি যার মূল্য ৪,৭৩,৫৩,০০০।
বিগত ২০১৩ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৬৫০ কোটি টাকা হুন্ডিওয়ালা শহিদ এবং জাহিদের মাধ্যমে দুবাই প্রেরণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারেন্সি করে লন্ডন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, আমেরিকা, ভারত এবং দুবাইতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ক্রয় করেছেন। ওই সম্পদ ক্রয়ের পর (লন্ডনের ক্ষেত্রে) টাইটেল ডিড নামক একটি দলিল কুরিয়ারের মাধ্যমে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নামে বাংলাদেশস্থ আরামিট অফিসে আসার পর ফাইল তার অফিস রুমে রেখে দেওয়া হতো, যা গোপন করার জন্য প্রথমে কালুরঘাট শিল্প এলাকার স্টোরে ও পরে বুকর্মীলা জামানের ড্রাইভার ইলিয়াসের বাড়িতে লুকানো হয়েছিল বলেন জানান আরামিটের এই দুই কর্মকর্তা।
জবানবন্দিতে তারা বলেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী তার নিজ নামে আরামিট সিমেন্ট পিএলসি (পাবলিক লি, কোম্পানি) হওয়া স্বত্বেও ওই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত সিমেন্ট বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানিকে সরবরাহ করে তার বিপরীতে ৯টি এপার্টমেন্ট ক্রয় করেন। যার মূলা ১০,৮২,০৪,৫০০ টাকা। তার মধ্যে ২টি এপার্টমেন্ট যার মূল্যমান ২ কোটি ৮১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আরামিট সিমেন্ট পিএলসির নামে হস্তান্তর করা হয়। এছাড়াও ঢাকার গুলশানে ৩৭ শত ৪৭ বর্গফুটের ১টি এপার্টমেন্ট যার মূল্য ৮কোটি ৫৯ লাখ টাকা ও ১টি এপার্টমেন্ট একই আয়তনের যার মূল্য ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। আরামিট পিএলসির টাকা জনগণের হলেও তা পরিচালনার দায়িত্বে থেকে নিজের নামে সম্পদ করেছেন।
তারা আরও বলেন, সাইফুজ্জামানের কৃষি সম্পত্তির পরিমাণ ২৭ লাখ ৪৩ হাজার ২৪৮ টাকা। বাংলাদেশে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর শেয়ার নর্থওয়েস্ট সিকিউরিটিজ ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আরামিট গ্রুপের ৬টি কোম্পানিতে মোট শেয়ারের মূল্য ১০ কোটি ৫৭ লাখ ২৪ হাজার ৩৫০ টাকা। রনি ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লি. কোম্পানিতে মোট শেয়ার মূল্য ৭৫ লাখ ৮২ হাজার ৪০০ টাকা। বুকমীলা জামানের ইউসিবিএল শেয়ার মূল্য ২ কোটি ৮৫ লাখ ৯৪ হাজার ৬৯০ টাকা। এছাড়া সাইফুজ্জামান চৌধুরীর জুয়েলারির মূল্য ৩ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। একটি এমপি কোটায় আমদানিকৃত ব্রান্ড নিউ ল্যান্ড ক্রজার গাড়ি ২০২৩ মডেল, যার মূল্য ১ কোটি টাকা। রোলস রয়েস গোস্ট ২০২৩ মডেল একটি গাড়ি দুবাইয়ে, দাম ৬ কোটি ঢাকা, রোলস রয়েস গোস্ট ২০২২ মডেল একটি গাড়ি লন্ডনে, দাম ৬ কোটি। এছাড়া আরামিট পিএলসির নামে মার্সিডিজ বেঞ্জ মডেল ২০২২, মূল্য ৪ কোটি। এ ছাড়া আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়ামের নামে বিএমডব্লিউ গাড়ি, যার মূল্য ২ কোটি ৫০ লাখ।
আরামিটের দুই কর্মকর্তার জবানবন্দি অনুযায়ী, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর স্ত্রী রুকমিলা জামান কাগজে চেয়ারম্যান হলেও মূলত ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং তার ছোট ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী। ব্যাংকের বোর্ড মিটিংয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী অংশগ্রহণ ও সভাপতিত্ব করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো একাই দিতেন। সাইফুজ্জামান চৌধুরী নিজেকে ব্যাংকের একক মালিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে ওরিয়ন গ্রুপ থেকে ২৪০ কোটি, থার্মেক্স থেকে ৫২ কোটি, এইচএম শিপ ব্রেকিং থেকে ৫৫ কোটি, সাইফ পাওয়ার টেক থেকে ৪১ কোটি, রুপায়ন হাউস থেকে ১০০ কোটি, বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে ১০০ কোটি, বেস্ট সার্ভিসেস লি. থেকে ১০০ কোটিসহ মোট ৬৮৮ কোটি টাকা ঘুষ/চাঁদা হিসেবে গ্রহণ করে বিদেশে হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করে নিজ এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। সাইফুজ্জামান চৌধুরীর স্ত্রী রুকমিলা জামান এবং সন্তানদের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে তাদের পক্ষে সাইফুজ্জামন চৌধুরী লেনদেন করতেন এবং তার নিজ হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করে পাচার করতেন। সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ছোট ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরীকে ইউসিবি ব্যাংকের ইসি চেয়ারম্যান করে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছেন। সূত্র : সমকাল

