গোপন কর্মসূচিতে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়েছে হাজারো আফগানকে
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ জুলাই ২০২৫
দেশ ডেস্ক:: ২০২২ সালে তথ্য ফাঁসের ঘটনায় যুক্তরাজ্যের হয়ে কাজ করা হাজার হাজার আফগান নাগরিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জীবন হুমকির মুখে পড়ায় ব্রিটিশ সরকার তাদের একটি গোপন কর্মসূচির মাধ্যমে ব্রিটেনে নিয়ে যায়—মঙ্গলবার এ তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি মঙ্গলবার পার্লামেন্টে এই গোপন কর্মসূচির কথা প্রকাশ করেন। এর আগে যুক্তরাজ্যের হাইকোর্ট এমন এক কঠোর গোপনীয়তা নির্দেশ (সুপার-গ্যাগ অর্ডার) প্রত্যাহার করে নেয়, যা এত দিন পর্যন্ত এই ঘটনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ বা পার্লামেন্টে আলোচনাও নিষিদ্ধ করে রেখেছিল।
হিলি জানান, তালেবান কাবুল দখলের মাত্র ছয় মাস পর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের এক কর্মকর্তার ভুলে প্রায় ১৯ হাজার আফগানের নাম ও বিবরণসংবলিত একটি স্প্রেডশিট ফাঁস হয়ে যায়, যারা ব্রিটেনে পুনর্বাসনের জন্য আবেদন করেছিল।
তিনি বলেন, ‘এটি ছিল মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুতর ভুল। এতে প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।’
পূর্ববর্তী কনজারভেটিভ সরকার ২০২৪ সালের এপ্রিলে ‘আফগান রেসপন্স রুট’ নামের এক গোপন কর্মসূচি চালু করে। যার উদ্দেশ্য ছিল তালেবান বাহিনীর প্রতিশোধের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিবেচনা করা আফগানদের সহায়তা করা।
হিলি জানান, এ কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০০ আফগান ও তাদের পরিবারের তিন হাজার ৬০০ সদস্যকে ব্রিটেনে আনা হয়েছে বা তারা যাত্রাপথে রয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন পাউন্ড (৫৩৫ মিলিয়ন ডলার)। এ ছাড়া আরো ৬০০ জনের আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পটির আনুমানিক মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৮৫০ মিলিয়ন পাউন্ড।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুল দখলের পর থেকে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাজ্যে গ্রহণ করা প্রায় ৩৬ হাজার আফগানের মধ্যে তারাও রয়েছে।
লেবার পার্টির বিরোধীদলীয় প্রতিরক্ষা মুখপাত্র থাকাকালে হিলিকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গোপন কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল। তবে তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকার আদালতের মাধ্যমে ‘সুপার-ইনজাংশন’ বা সর্বোচ্চ গোপনীয় নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যা পার্লামেন্ট কিংবা সংবাদমাধ্যমে এ কর্মসূচির কোনো উল্লেখ নিষিদ্ধ করেছিল।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে লেবার সরকার ক্ষমতায় আসার পরও কর্মসূচিটি চলমান ছিল। হিলি বলেন, তিনি পার্লামেন্টকে কিছু জানাতে না পারায় ‘গভীর অস্বস্তি’ অনুভব করছিলেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘তৎকালীন মন্ত্রীরা পার্লামেন্ট সদস্যদের ঘটনাটি না জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ ব্যাপক প্রচার হলে তালেবানদের হাতে ওই তথ্য পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ত।’
‘প্রতিশোধের প্রমাণ নেই’
নতুন সরকারে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর হিলি এ কর্মসূচির পর্যালোচনা করেন। তিনি এ-ও জানান, ‘প্রতিশোধমূলক অভিযান চালানোর জন্য তালেবানের অভিপ্রায়ের খুব সামান্য প্রমাণই পাওয়া গেছে।’ এরপর ‘আফগান রেসপন্স রুট’ কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘এ ধরনের তথ্য ফাঁস কোনোভাবেই ঘটানো উচিত ছিল না।’
আফগান নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে পুনর্বাসনের মোট ব্যয় ৫.৫ বিলিয়ন থেকে ৬ বিলিয়ন পাউন্ডের মধ্যে হবে বলে অনুমান করেন হিলি।
এদিকে কনজারভেটিভ পার্টির প্রতিরক্ষা মুখপাত্র জেমস কার্টলিজও তথ্য ফাঁসের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন, যা তাদের সরকারের আমলে ঘটেছিল। তবে তিনি ঘটনাটি গোপন রাখার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের কোনো কর্মকর্তার একটি ভুল যেন তালেবানদের হাতে পড়ে নিরীহ মানুষদের নির্যাতন কিংবা হত্যাকাণ্ডে পরিণত না হয়, সেটাই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল।’
হিলি বলেন, আফগানিস্তান থেকে যাদের যুক্তরাজ্যে আনা হয়েছে, তারা সবাই দেশটির অভিবাসন পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার অভিবাসন হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
২০২৩ সালে কাবুলের পতনের সময় তালেবানের হাত থেকে পালাতে চাওয়া ২৬৫ জন আফগানের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করায় যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে সাড়ে তিন লাখ পাউন্ড জরিমানা করে তথ্য কমিশনার। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার কর্মসূচি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এমপিরা এটিকে ‘নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তালেবানের প্রতিহিংসার ঝুঁকিতে থাকা বহু আফগানকে ফেলে আসা হয়, এমনকি কাবুলে পরিত্যক্ত ব্রিটিশ দূতাবাসে কর্মীদের ও চাকরিপ্রার্থীদের তথ্য রেখে আসা হয়, যা তাদের জীবনকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছিল।

