লন্ডনে পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন: সাংবাদিক এটিএম তুরাবকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে পুলিশ
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ আগস্ট ২০২৪
দেশ ডেস্ক, ৩১ জুলাই ২০২৪ :: সিলেটে সাংবাদিক এটিএম তুরাবকে পুলিশ পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে বলে পরিবার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। পরিবার ও স্বজনদের অভিযোগ, সীমান্তে চোরালান নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক প্রতিবেদন করায় পুলিশ ক্ষুব্ধ হয়ে পরিকল্পিতভাবে তুরাবকে হত্যা করেছে। এই ঘটনায় তুরাবের ভাই জাবুর আহমেদ বাদি হয়ে জড়িত ৮-১০ জন পুলিশকে আসামী করে সিলেট কোতোয়ালী থানায় এজাহার দায়ের করলেও পুলিশ এখনো মামলা গ্রহণ করেনি।
গত ২৬ জুলাই লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবে পরিবার পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করা হয়। এসময় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাংবাদিক তুরাবের বড় ভাই ফ্রান্স প্রবাসী আবুল কালাম শরীফ। এসময় সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস উন নূর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
গত ১৯ জুলাই কোটাবিরোধী আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্বপালনকালে বন্দরবাজারে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। তিনি দৈনিক জালালাবাদ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার ও দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার সিলেট প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করতেন। তুরাব বিয়ানীবাজার প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বিয়ানীবাজার পিএচজি হাই স্কুলের শিক্ষক আব্দুর রহিমের ছেলে।
লিখিত বক্তব্যে সাংবাদিক তুরাবের বড় ভাই ফ্রান্স প্রবাসী আবুল কালাম শরীফ বলেন, আজ আমি ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আমি একজন ফ্রান্স প্রবাসী । আমি ফ্রান্স থেকে আমার ভাই পুলিশের গুলিতে নিহত সিলেট প্রেস ক্লাবের সদস্য সাংবাদিক আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাবেব হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আমার ভাই এটিএম তুরাব সিলেটের নন্দিত দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার ও জাতীয় দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তিনি বলেন, দেশে চলমান কোটা বিরোধী আন্দোলনে গত ১৯ জুলাই শুক্রবার বাদ জুম্মা সিলেটের বন্দরবাজার কালেক্টর জামে মসজিদ থেকে নামাজ শেষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সিলেট একটি মিছিল বের করে। মিছিলটির পিছন থেকে পুলিশ বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশের বাধা অমান্য করে মিছিল নিয়ে সামনে এগুতে চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দিলে এই সময় এটিএম তুরাব রাস্তার সাইড থেকে ঘটনার ছবি ও ভিডিও ধারণ করার সময় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ উত্তরের উপপুলিশ কমিশনার গোলাম দস্তগীরের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সদস্য সরাসরি তুরাবের উপর এলোপাতাড়িভাবে গুলি বর্ষণ করলে ঘটনাস্থলে মারাত্মক আহত গুলিবিদ্ধ তুরাব মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তুরাব আহত গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাটিতে গড়াগড়ি করলেও পাশে থাকা কোনো পুলিশ চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা কিংবা তাকে হাসপাতালে প্রেরণ করেননি। ঘটনার অনেকক্ষণ পরে তাকে সাংবাদিকরা অটোরিকশাযোগে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। শুক্রবার থাকায় সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার না থাকায় একজন নার্স থাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। কিন্তু তুরাবের শরীরে প্রায় ৯৮ গুলিবিদ্ধ হওয়ায় প্রচুর রক্তকরণে তার অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে সাংবাদিকরা তাকে সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করেন। সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬:৪৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আমার ভাই সাংবাদিক তুরাব। সিলেট ওসমানী হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তার সামছুল ইসলামের রিপোর্ট থেকে জানা যায় ৯৮ টি গুলি তুরাবের শরীরে লেগেছে। ছবি দেখলে বুঝা যাবে আমার নিরীহ, নিরাপরাধ ভাইয়ের উপর পুলিশ কিভাবে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ঝাঝরা করেছে তার বুক। কোনো বিবেকবান মানুষ এভাবে বুকে সরাসরি গুলি করতে পারেনা। আমরা মনে করি আমার ভাইকে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত ভাবে পুলিশ খুন করেছে। রাষ্টে্রর জনগনের নিরাপত্তার নিশ্চিত করা যে পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব সেই পুলিশ কীভাবে একজন সাংবাদিকের উপর নির্মম গুলি বর্ষণ করতে পারে আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন?
চিনি চোরাচালান নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন করায় পুলিশ তুরাবকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে উল্লেখ করে আবুল কালাম শরীফ বলেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি ঘটনার সময় তুরাব জুম্মার নামাজ শেষে পুলিশ এবং বিএনপির মধ্যকার ছবি এবং ভিডিও ধারণ করেছিলেন। তখন তিনি নিরাপদ দূরত্বে ও তার পরনে বড়ো করে লেখা প্রেসের জ্যাকেট এবং হেলমেট ছিলো। তাই ঘটনার আলমত দেখলে বুঝা যায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ উত্তরের উপপুলিশ কমিশনার গোলাম দস্তগীরের নেতৃত্বে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত ভাবে তুরাবকে হত্যা করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। তুরাব বিগত প্রায় দুই বছর থেকে সিলেটের দৈনিক জালালাবাদে একাধিক ক্রাইম রিপোর্ট করে আলোচিত হয়েছেন। সর্বশেষ দেশবাপী আলোচিত চিনিকান্ড নিয়ে তিনি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেন যে ঘটনার সাথে সিলেটের সীমান্তের থানাগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। তাছাড়া অভিবাসন নিয়ে তুরাবের একটি রিপোর্টের জন্য সে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়।
এই ঘটনায় জড়িত কয়েকজন পুলিশকে আসামী করে থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ মামলা গ্রহণ করেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ঘটনায় জড়িত ৮ -১০ পুলিশকে আসামী করে সিলেট কোতোয়ালী থানায় আমার ভাই জাবুর আহমেদ বাদী হয়ে এজাহার দায়ের করলেও পুলিশ এখনো মামলা রেকর্ড করেনি। পুলিশ কর্তৃক তুরাবের উপর হামলা চালিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আমরা বিচার বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।
পিতার আদর্শকে লালন করে তুরাব সাংবাদিকতা পেশায় এসেছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তুরাব মাত্র দুমাস আগে যুক্তরাজ্য প্রবাসী তরুণীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামীকে অকালে হারিয়ে তার স্ত্রী ও আমাদের পরিবারের সবার মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। বৃদ্ধ মা ছেলে হারানো ঘটনায় বার বার অজ্ঞান হচ্ছেন। মেহেদির রং শুকানোর আগেই মাত্র ৩৩ বছর বয়সে এভাবে আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হবে তা আমরা ভাবতে পারিনি। আমার পিতা বিয়ানীবাজার প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এছাড়াও তিনি বিয়ানীবাজার পিএচজি হাই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। পিতার আদর্শকে লালন করে এটিএম তুরাব সাংবাদিকতা পেশায় এসেছিলেন। স্বপ্ন ছিল মানুষের জন্য কাজ করার। এই ঘটনায় মামলা রেকর্ড স্বাপেক্ষে সুষ্ঠু তদন্ত শেষে জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি দাবী করছি।

