সাদাপাথর ও জাফলং ‘মৃত্যুকূপ’
প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ আগস্ট ২০২৩
দেশ ডেস্ক:: সিলেটের জাফলং ও সাদাপাথর দেশজুড়ে পরিচিত দু’টি পর্যটন স্পট। এই দু’টি স্পটে প্রতিদিন ছুটে যান হাজারো পর্যটক। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন তারা। কিন্তু অসচেতন পর্যটকদের মৃত্যুর কূপে পরিণত হয়েছে এ দু’টি এলাকা। পানিতে সাঁতার কাটতে গিয়ে তলিয়ে গিয়ে মারা যাচ্ছেন পর্যটকরা। কতো ট্র্যাজেডির জন্ম দিচ্ছে এ দু’টি স্পট। বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন সবাই। গতকালও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথরে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে শুক্রবার জাফলংয়ে মারা গেছেন আরেক পর্যটক। ক’দিন আগে চার বন্ধু বেড়াতে এসে এক বন্ধুর লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।
স্থানীয়দের পরিসংখ্যান মতে; পুরাতন পর্যটক হওয়ায় সিলেটের জাফলংয়ে গত দুই দশকে অর্ধশতাধিক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটে জিরো পয়েন্ট এলাকায়। স্বচ্ছ পানির মধ্যে জলকেলীতে নেমে হারিয়ে যাচ্ছেন অসচেতন থাকা পর্যটকরা। এরপর ভেসে উঠে মৃতদেহ। শুক্রবার জিরোপয়েন্ট এলাকায় সাঁতার কাটতে গিয়ে নিখোঁজ হন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার রমিজ উদ্দিন। তারা মানিকগঞ্জ থেকে রিজার্ভ বাস নিয়ে জাফলং বেড়াতে এসেছিলেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- দুপুরের দিকে রমিজ উদ্দিনসহ আরও ক’জন মিলে পর্যটন কেন্দ্রের জিরো পয়েন্ট এলাকায় নদীতে গোসল করতে নামেন।
গোসলের এক পর্যায়ে রমিজ উদ্দিন স্রোতের টানে পানিতে তলিয়ে যায়। এরপর তার সঙ্গে থাকা লোকজন এবং স্থানীয়রা দেখতে পেয়ে তাকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ, জাফলং ট্যুরিস্ট পুলিশ, জৈন্তাপুর ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় ডুবুরীরা কয়েক ঘণ্টা উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে বিকাল ৫ টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করেন। রমিজ উদ্দিনের সঙ্গে থাকা লুৎফুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, রমিজসহ তারা তিন-চারজন গোসল করার জন্য নদীতে নামেন। এ সময় স্রোতের টানে রমিজ পানিতে তলিয়ে যান। এদিকে- কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর নতুন পর্যটক স্পট। এখনো ওখানে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যটন পুলিশের কার্যক্রম শুরু হয়নি। এই তিন বছরে সাদাপাথরে অন্তত ১২ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল ঢাকার মগবাজারের বাসিন্দা জয় নামের এক পর্যটক সাঁতার কাটার সময় পানিতে তলিয়ে যান। পুলিশ জানায়- জয় সাদাপাথরে গোসল করতে নেমেছিলেন। এ সময় পানির প্রচণ্ড স্রোতে তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি।
মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে যান। পরে সেখানে উপস্থিত ও তার সঙ্গের লোকজন খোঁজাখুঁজি করে প্রায় ১৫ মিনিট পরে তাকে পান। পরে তাকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। সাদাপাথর ও জাফলং ছাড়া সিলেটের অন্যতম পর্যটন স্পট হচ্ছে- বিছনাকান্দি। যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক থাকায় এখানে গত দু’বছর ধরে কমসংখ্যক পর্যটক যাচ্ছেন। ফলে এখন সেখানে মৃত্যু নেই। তবে- গেল কয়েক বছরে ওই স্পটে ৫-৬ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। সিলেটের পর্যটনস্পটগুলোর মধ্যে জাফলংয়ে প্রতিনিয়ত পর্যটক পুলিশ টহলে। এছাড়া, রাতারগুল, বিছনাকান্দিতেও আছে পর্যটন পুলিশের টহল।
এর বাইরে বিজিবি ও পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। এতো নিরাপত্তার ফাঁক গলিয়ে পর্যটকদের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- জাফলং, বিছনাকান্দি ও সাদাপাথরে পর্যটকরা বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন। এ সময় অনেকেই পানিতে তলিয়ে গিয়ে স্রোতের কাছে হার মানেন। সঙ্গে থাকা লোকজনও বিষয়টি টের পান না। এ কারণে ঘটে দুঘর্টনা। পর্যটন পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ড টাঙানো আছে। এরপর সিলেটের বাইরের পর্যটকরাও অসচেতন হয়ে পড়লে দুর্ঘটনায় পড়েন। ট্যুরিস্ট পুলিশ সিলেট অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. বিলাল হোসেন সোমবার বিকালে জানিয়েছেন- ছুটির দিনে হাজারো পর্যটক এসে একসঙ্গে নামেন। পুলিশ সার্বক্ষণিক সতর্ক করে দিচ্ছে।
অনেককে আবার তীরে উঠানো হচ্ছে। এর মধ্যেও ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি ঘটনা দুঃখ দেয়, মর্মাহত করে। বেড়াতে এসে স্বজনরা লাশ নিয়ে ফিরেন, এর চেয়ে দুঃখের আর কী হতে পারে। আমরা চেষ্টা করছি বেড়াতে আসা পর্যটকদের সচেতন করার মাধ্যমে দুঘর্টনা এড়ানোর। সব পর্যটন স্পটেই পুলিশ রয়েছে। প্রয়োজনে আরও বেশি কড়াকড়ি আরোপ করা হবে বলে জানান তিনি। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান জানিয়েছেন- বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যাতে কেউ গোসল করতে না নামেন এজন্য সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ হ্যান্ডমাইক দিয়ে সার্বক্ষণিক প্রচার চালান। কিন্তু অনেকেই এসব সতর্কতা মানতে চান না। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।

