বিমানের টিকিট নিয়ে সিলেটে এ কেমন বাণিজ্য
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ আগস্ট ২০২৩
দেশ ডেস্ক:: সিলেট-লন্ডন, সিলেট-ম্যানচেষ্টার রুটে দেশি সংস্থা বিমানের টিকিট যেন ‘সোনার হরিণ’। গত তিন বছর ধরে স্টুডেন্ট ভিসা, কেয়ার ভিসা, ওয়ার্কপারমিট, ভিজিট ভিসায় সিলেটের অধিকসংখ্যক যাত্রী যুক্তরাজ্য যাচ্ছেন। সব প্রক্রিয়া শেষ করার পর আটকে যান বিমান টিকিটে। সব সময়ই টিকিট সংকট। টাকা দিয়েও মিলে না বিমানের টিকিট। এ কারণে ‘গোপন চ্যানেলে’ দিগুণ, তিনগুণ টাকা দিয়ে টিকিট কিনে যাত্রীদের যুক্তরাজ্যে যেতে হচ্ছে। এ নিয়ে সিলেটে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ইতিমধ্যে সিলেটবাসী বিমানের টিকিটের মূল্য বিশ্বের অন্যান্য এয়ারলাইন্সের সঙ্গে সমন্বয় করার দাবি তুলেছেন। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এখানে দেশি-বিদেশি যেকোনো এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ ওঠা-নামা করতে পারবে। ট্রাভেলস এজেন্সির মালিকরা জানিয়েছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও গ্রাউন্ড সার্ভিস না দেয়ার কারণে বিদেশের এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলো সিলেটে আসতে পারছে না। এ কারণে একমাত্র বিমানই সিলেট থেকে বহির্বিশ্বে ফ্লাইট অপারেট করে।
বিমান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমান যে ব্যবসা করে তার ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ ব্যবসা সিলেটের যাত্রী থেকেই করে। কারণ হচ্ছে- ইমিগ্রেশন হয়রানি, লাগেজ নিরাপত্তার অভাবের কারণে সিলেটে যাত্রীরা ঢাকা হয়ে বহির্বিশ্বে যেতে চান না।
এজন্য সিলেটে যাত্রীদের প্রথম পছন্দ সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে বহির্বিশ্বে যাতায়াত করা। কিন্তু এ যাওয়া নিয়ে এখন টিকিটের জন্য রীতিমত যুদ্ধ করতে হচ্ছে যাত্রীদের। মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগী একটি চক্র প্রতি মাসে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এখন প্রতি সপ্তাহে ৭টি ফ্লাইট কেবল যুক্তরাজ্যের দুটি রুটে চলাচল করে। এর মধ্যে লন্ডনের হিথ্রোতে ৪টি ও মানচেস্টারে ৩টি ফ্লাইট অপারেট করা হয়। বিমানের এক কর্মকর্তার পরিসংখ্যান মতে- শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যের রুটে গড়ে প্রতি সপ্তাহে ২১শ’ যাত্রী সিলেট ছাড়েন।
এতে দেখা গেছে মাসে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার যাত্রী এবং বছরে এক লাখের উপরে যাত্রী ওই রুট ব্যবহার করছেন। গত তিন বছর ধরে স্টুডেন্ট, কেয়ার ভিসা, ওয়ার্কপারমিটে ৩ লাখের উপরে যাত্রী ওই রুটে দেশ ছেড়েছেন। খবর নিয়ে জানা গেল, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিথ্রো কিংবা মানচেস্টার রুটে বিমানের কোনো টিকিট নেই। ডিসেম্বর পর্যন্তও ইকোনমিক ক্লাসের টিকিট সংকট রয়েছে। গত ৪ মাস ধরে একইভাবে সংকট বিরাজমান।
বাংলাদেশ বিমানের সিলেট অফিসের টিকিট বিভাগ, ট্রাভেলস এজেন্সিতে খোঁজ নিয়েও টিকিট মেলেনি। তবে বিকল্প পথ আছে। দিগুণ কিংবা তিনগুণ দামে মিলছে টিকিট। সেটি কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ট্রাভেলস এজেন্সির কাছ থেকে জানা গেল অনেক তথ্য। কয়েকটি এজেন্সির মালিকরা জানিয়েছেন, গোটা বছরই সিলেট থেকে যুক্তরাজ্যর দুটি রুটে বিমানের টিকিটের সংকট লেগেই থাকে।
ওয়েবসাইটে গেলে টিকিট পাওয়া যায় না। কিন্তু সিলেটের কয়েকটি বড় ট্রাভেল এজেন্সি বিমানের টিকিট বিভাগের কিছু কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে বেশিদামে টিকিট নিয়ে আসেন এবং তারা আরেক দফা দাম বাড়িয়ে সেই টিকিট বিক্রি করেন। এতে দেখা গেছে ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের দুটি রুটের মধ্যে যেকোনো রুটে বিমানের একটি ওয়ানওয়ে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। কেবলমাত্র নির্ধারিত মূল্য পাচ্ছে বিমান কর্তৃপক্ষ। মাঝখানে মধ্যস্কত্বভোগীরা লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
এক এজেন্সির মালিক জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের শুরুতে এক স্টুডেন্ট ভিসার যাত্রীর টিকিটের মূল্য হাকা হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। এগুলো হচ্ছে লটারীর মতো। যারা বেশি দাম দেবে তারাই টিকিট পাবে। সম্প্রতি হিথ্রো ও মানচেস্টার দিয়ে লন্ডনে প্রবেশ করা কয়েকজন যাত্রী জানিয়েছেন, তারা জরুরি ভিত্তিতে সিলেট থেকে টিকিট করে এসেছেন। দেড় লাখ টাকা দিয়ে ওয়ানওয়ে টিকিট করে এসেছেন। কিন্তু যে ট্রাভেলস এজেন্সি তাদের টিকিট দিয়েছে ওই টিকিটের গায়ে ভাড়ার মূল্য লিখা ছিল না।
কয়েকজন ট্রাভেলস এজেন্সির মালিক জানিয়েছেন, বিমানের এক শ্রেণির কর্মকর্তা ওয়েবসাইটের সফটওয়্যারে টিকিট ‘হাইড’ করে রেখে দেন। পরে তারা নির্ধারিত এজেন্সির মাধ্যমে এগুলো বেশি দামে বিক্রি করেন। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া- যাত্রী অনুপাতে সিলেটে বিমানের এমনিতেই আসন সংকট। সপ্তাহে ৭টি ফ্লাইট যথেষ্ট না।
ওই ফ্লাইটগুলোতে আবার ঢাকার যাত্রীরা থাকে। ফলে সিলেটের বিমান হলেও সব আসন পান না যাত্রীরা। সিলেটের যাত্রীক ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের অন্যতম শীর্ষ নেতা আব্দুল জব্বার জলিল জানিয়েছেন, সিলেটে অন্য কোনো এয়ারলাইন্সের সেবা না থাকার কারণে বিমান ‘মনোপলি’ ব্যবসা করছে।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানাচ্ছি বাইরের এয়ারলাইন্সগুলোকে সিলেটে নিয়ে আসতে। কিন্তু এতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সিলেটে ওমরা, পর্যটনসহ নানা খাতে যাত্রী বেড়েই চলেছে। সপ্তাহে একদিন জেদ্দা ফ্লাইট দেয়া হয়। এতে সঙ্কুলান না হওয়া হজ্বযাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। সময় এসেছে সরকারের নীতি নির্ধারক মহলে এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার।
সিলেটের যাত্রীদের নিয়ে এক ধরনের তামাশা হচ্ছে, যা বিশ্বের আর কোথাও এ ধরনের সিস্টেম নেই বলে জানান তিনি। আটাব সিলেট অঞ্চলের সভাপতি জিয়াউর রহমান খান রেজওয়ান জানিয়েছেন, টিকিট নিয়ে বিমানের সিন্ডিকেট থাকলে তিনি জানেন না। তবে- কোনো ট্রাভেলস এজেন্সি বেশি দাম নিলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে তিনি যাত্রীদের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, বিমান সিলেটের যাত্রীদের চাপ দেখে দফায় দফায় দাম বাড়ায়। সেটি নিয়ে আমরা কথা বলছি। কিন্তু নীতি নির্ধারক মহল সে ব্যাপারে কোনো কর্ণপাত করছেন না বলে জানান তিনি। বিমান সিলেটের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. মনসুর আহমদ আহমদ ভূঁইয়া রোববার বিকালে কাছে স্বীকার করেছেন সিলেট থেকে যাত্রী বেশি, ফ্লাইট কম।
বিশেষ করে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে কোনো টিকিট নেই। পিক টাইম হওয়ার কারণে এমনটি হচ্ছে। বিমানের সিলেট অফিসে টিকিট নিয়ে কোনো সিন্ডিকেট হচ্ছে না, ওয়েবসাইটে টিকিট ‘হাইড’ করে রাখার সুযোগ নেই। ইকোনিক ক্লাসে অনেক সময় টিকিট আগেই শেষ হয়ে যায়। এ কারণে অন্য ক্লাসের টিকিটে একটু বেশি দামে টিকিট মিলে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কোটি কোটি টাকার টিকিট বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।

