সিলেটের ২৫০০ নমুনা পাঠানো হলো ঢাকায়
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ জুন ২০২০
দেশ ডেস্ক: সিলেটে একাত্তর টিভি’র সাংবাদিক সাকিব আহমদ মিঠু গত ২রা জুন করোনা টেস্টের জন্য তার নমুনা দিয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি বার বার রিপোর্ট জানার চেষ্টা করেও পাননি। পরে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে জানলেন তার রিপোর্ট নেগেটিভ। একই দিনে নমুনা দিয়েছিলেন বাসসের সাংবাদিক শোয়েব হাসান। প্রায় ১৮ দিন আগে তার করোনা উপসর্গ ছিলো। ঘরে অসুস্থ মা। সতর্কতার জন্য তিনি শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে গিয়ে নমুনা দেন। বৃহস্পতিবার তার রিপোর্ট আসে পজিটিভ।
এই সময়ের মধ্যে তিনি মায়ের সেবায় ব্যস্ত ছিলেন। শুধু তারা দু’জনই নয়, সহকর্মীরা একেক করে আক্রান্ত হওয়ায় বেশ কয়েকজন সাংবাদিক টেস্টের জন্য নমুনা দিয়েছিলেন। ১২ দিন অপেক্ষার পর তারা রিপোর্ট জেনেছেন। প্রায় দেড় মাস আগেও সিলেটে স্বাস্থ্য কর্মীদের বেলায়ও এমন ঘটনা ঘটেছিলো। ওসমানীর আইসিইউতে দায়িত্ব পালনকারী ৫ জন নার্সের নমুনার পজেটিভ রিপোর্ট এসেছিলো ১০ দিন পর। ততক্ষণে তারা সুস্থ হয়ে গেছেন। রিপোর্ট আসার দু’দিন পর তারা ফের করোনা টেস্ট করালে রিপোর্ট নেগেটিভ আসে।
কেন এমন হচ্ছে- এই প্রশ্নের উত্তর জানতে গিয়ে দেখা গেলো গত ২রা জুন থেকে সিলেটে নতুন করে নমুনা জট দেখা দিয়েছে। এ কারনে স্বাস্থ্য বিভাগের তরফ থেকে একত্রিত করে প্রতিদিনই নমুনা ঢাকায় পাঠাচ্ছেন। আর ঢাকায় যেসব নমুনা যাচ্ছে তার রিপোর্ট আসছে ১০ থেকে ১২ দিন পর। তার আগেই নমুনা প্রদানকারী অনেকেই সুস্থ হয়ে উঠছেন। কেউ কেউ কর্মস্থল, কিংবা বাড়িতে থেকেও স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। তাদের দ্বারা সিলেটে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশনও হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- নমুনা জটের কারনে সিলেটে করোনার সঠিক পরিসংখ্যান মিলছে না। অনেকেই করোনা নিয়ে ঘুরছেন কিন্তু তিনি নিজেও জানেন না করোনা আক্রান্ত। সিলেটে নমুনা টেস্টের জায়গা দুটি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ওসমানী মেডিকেল কলেজ এবং অপরটি হচ্ছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব। এ দুটি ল্যাবে প্রতিদিন ১৮০ টি করে ৩৬০টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়। কিন্তু প্রতিদিন সিলেট জেলাতেই নমুনা সংগ্রহ করা হয় প্রায় ৪০০। এর বিভাগের অপর তিন জেলা মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে নমুনা সংগ্রহ হয় ৬০০ জনের। ফলে এক হাজার নমুনা পরীক্ষা করার মতো সিলেটের দুটি ল্যাবে সুযোগ নেই। এ কারণে সাহায্য নিতে হচ্ছে ঢাকার আগার গাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব রিসার্স সেন্টারের ল্যাবের। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জট কমাতে প্রতিদিনই সংগ্রহ করা নমুনা ঢাকায় পাঠাচ্ছেন। কিন্তু ঢাকায় যাওয়া নমুনার রিপোর্ট আসছে ১০ থেকে ১২ দিন পর। এই মুহূর্তে সিলেটে প্রায় আড়াই হাজার নমুনা পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তার উপর গত দু’দিনেও ঢাকায় গেছেন ৫০০ উপরে নমুনা। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে- সিলেটে দুটি ল্যাবে সংকুলান না হওয়ার কারনে শুরু থেকেই ঢাকায় যাচ্ছে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নমুনা। এ দুটি জেলার রিপোর্ট প্রতিদিন আপডেট করা সম্ভব হচ্ছে না। কারন- প্রতিদিনই দুটি জেলার রিপোর্ট আসছে না। ৩-৪ দিন পরপর রিপোর্ট আসছে। রিপোর্ট আসার পর সেটি আপডেট করা হচ্ছে।
তবে- সিলেট ও সুনামগঞ্জের একাংশের নমুনার ল্যাব রিপোর্ট প্রতিদিনই জানা সম্ভব হচ্ছে। ওসমানীতে প্রতিদিন দিনে ও রাতে ১৮৮টির মতো নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ফলোআপ রিপোর্ট থাকে বেশি। পাশাপাশি বিভিন্ন বাহিনী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ডাক্তার ও নার্সদের নমুনা থাকে বেশি। গত কয়েক দিনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে- ওসমানীর ল্যাবে সাধারণ মানুষের নমুনা পরীক্ষার সুযোগ মিলছে কম। শামসুদ্দিন হাসপাতালে সংগ্রহ করা নমুনার খুব কম অংশই সিলেটের ল্যাবে সুযোগ পায়।
এ কারণে সিলেটে জুন মাসের প্রথম থেকেই নমুনা জট তীব্র হয়েছে। আর ওই সময় থেকে নমুনা ঢাকায় পাঠানো শুরু হয়েছে। এ কারণে এখন রিপোর্ট পেতে অনেক বিলম্ব হচ্ছে। ওসমানীর ল্যাবে আগে একদিন পরপর নমুনা রিপোর্ট পাওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু এখন এই ল্যাবেই রিপোর্ট পেতে ৩-৪ দিন সময় লেগে যায়। আর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে যেসব নমুনার রিপোর্ট হয় সেগুলোও সুনামগঞ্জের। সুনামগঞ্জে সংগ্রহ করা নমুনা এই ল্যাবে প্রতিদিন পরীক্ষা করার কারনে রোগী বাড়ছে। ইতিমধ্যে সুনামগঞ্জে রোগী সংখ্যা চারশ’ পাড়ি দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সিলেটের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান জানিয়েছেন- সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা তারা প্রতিদিন ঢাকার আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব রিসার্স সেন্টারে পাঠান। সেখানে টেস্টের পর প্রতিদিনই রিপোর্ট আসে। যে রিপোর্টগুলো আগে যায় সেগুলোই আগে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। ল্যাব সংকটের কারণে সিলেটে টেস্ট করা সম্ভভ হচ্ছে না। এ কারনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি সিলেটে ল্যাব বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান তিনি। সিলেটে নমুনা জট দেখা দেওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেনের কানে পৌঁছেছে। তিনি বৃহস্পতিবার একটি ভিডিও বার্তায় আরো ল্যাব স্থাপনের আশ্বাস দিয়েছেন।
মন্ত্রী জানান- সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজে আরো একটি ল্যাব স্থাপনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারিভাবে সিলেটের সীমান্তিকের পক্ষ থেকে একটি ল্যাব স্থাপন করা হবে। এছাড়া হবিগঞ্জে একটি ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো একটি ল্যাব স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে- পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিডিও বার্তায় বললেও সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানে না। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. হিমাংশু লাল জানিয়েছেন- পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন সে কারনে ল্যাব স্থাপন হবে। বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানালে প্রক্রিয়া শুরু করবেন বলে জানান তিনি।

