যে কারণে শ্রমিকদের ‘কাঠগড়ায়’ সিলেটের পরিবহন নেতা ফলিক
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ জুন ২০২০
সিলেট, ০২ জুন :: সিলেটে পরিবহন সেক্টরে ৬২ উপশাখা। শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার। বিশাল এই বহরকে ‘এক হাতে’ নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন সিলেটের পরিবহন সেক্টরের প্রভাবশালী নেতা সেলিম আহমদ ফলিক। ডাক দিলেই রাস্তায় নেমে পড়ে হাজার হাজার শ্রমিক। দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাই। কিন্তু সেই সেলিম আহমদ ফলিকের বিরুদ্ধে এবার রাস্তায় নেমেছে পরিবহন শ্রমিকরা। গত মঙ্গলবার তারা দিনভর নগরীর দক্ষিণ সুরমায় হাতে লাঠিসোটা নিয়ে বিক্ষোভ করেছে। এই বিক্ষোভে ভীত নয় সেলিম আহমদ ফলিক।
নিজের নিয়ন্ত্রিত শ্রমিকদের একাংশ নিয়েও তিনি অবস্থানে ছিলেন। কদমতলী এলাকার পাম্পে তিনিও ছিলেন প্রতিরোধ অবস্থায়। এ নিয়ে গত মঙ্গলবার দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করে সিলেটের দক্ষিণ সুরমায়। আর পরিবহন সেক্টরে বিরাজ করে টান টান উত্তেজনা। বিক্ষোভকারী শ্রমিক অংশের দাবি সেলিম আহমদ ফলিক শ্রমিকদের কল্যাণ ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর প্রতিবাদ করায় তিনি তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে শ্রমিকদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। অন্যদিকে সেলিম আহমদ ফলিক টাকা আত্মসাতের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। মহামারি করোনা কাল চলছে। সিলেটেও গাড়ির চাকা ঘুরেনি। সবখানেই ছিল স্থবির অবস্থা। দুই মাসের অধিক সময়ের বন্দিজীবন। এই সময়ে সিলেটের পরিবহন শ্রমিকরা সংকটে পড়েন। অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটান তারা। তবে ৬২টি শাখা সংগঠন তাদের নিজেদের তহবিল থেকে শ্রমিকদের পাশে ছিল। প্রায় অর্ধকোটি টাকার ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু ওই ত্রাণ পর্যাপ্ত ছিল না। ১৩ হাজার শ্রমিকের জন্য যে পরিমাণ খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে এতে তাদের এক সপ্তাহের চাহিদা মিটেনি বলে দাবি করেন শ্রমিকরা। এই অবস্থায় ঈদ সামনে। শ্রমিকরা ছিলেন অসহায়।
জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা জসিম আহমদ সহ কয়েকজন গিয়ে সংগঠনের সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিকের কাছে কল্যাণ ফান্ডের টাকার একাংশ শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণের দাবি জানান। এতে সাড়া দেননি সেলিম আহমদ ফলিক। তার দাবি ওই টাকা মৃত শ্রমিকদের পরিবারের। কোনো ভাবেই এই টাকা দেয়া সম্ভব নয়। এ নিয়ে ফলিক সহকর্মী পরিবহন শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেন। এতে ক্ষুব্ধ হন শ্রমিকরা। ঈদের দু’দিন আগে তারা নগরের দক্ষিণ সুরমার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। ঈদের আগে কল্যাণ ফান্ড থেকে কর্মহীন শ্রমিকদের সহযোগিতা করার দাবি করেন। এ সময় মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসেন কয়েকজন সিনিয়র শ্রমিক নেতা। তারা বিষয়টি দেখে দেবেন বলে শ্রমিকদের শান্ত করেন। যখন শ্রমিকরা শান্ত হন তখন সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিকের ছেলে রোকনের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী পরিবহন শ্রমিকদের ওপর হামলা করে বলে দাবি করেন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। এই হামলায় কয়েকজন শ্রমিক আহত হন।
সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি রুনু মিয়া জানিয়েছেন, ফলিকের ছেলের নেতৃত্বে সশস্ত্র অবস্থায় পরিবহন শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিকরা মর্মাহত হন। তিনি জানান, ওই সময় আমরা কল্যাণ তহবিলে খোঁজ নিয়ে জেনেছি তহবিলে ৩১ লাখ টাকা রয়েছে। এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকা থাকার কথা। কিন্তু ফলিকের ছেলে আমেরিকা যাওয়ার সময় ক্যাশিয়ার শামসুল হক মানিকের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেয়। বিষয়টি জানাজানি হলে ৩১শে মে ফলিকের ছেলে আমেরিকা থেকে ওই টাকা কল্যাণ তহবিলে অ্যাকাউন্টে জমা দেয়। এখনো আরো ৮-৯ লাখ টাকার কোনো হিসাব মিলছে না। সেলিম আহমদ ফলিক ওই টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে দাবি করেন রুনু মিয়া। তহবিল থেকে টাকা নিতে হলে কার্যকরী কমিটির সম্মতির প্রয়োজন হয় বলে জানান তিনি।
এদিকে টাকা আত্মসাৎ ও ছেলে দিয়ে হামলার ঘটনায় মঙ্গলবার থেকে ফের ক্ষুব্ধ হয়েছেন সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। সংগঠনের মূল কার্যালয় নগরীর বাবনা মোড়ে। সংগঠনের কার্যালয়ে সকালে অবস্থান নেন কয়েক শ’ শ্রমিক। এক পর্যায়ে তারা সেলিম আহমদ ফলিকের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে বাবনা মোড়ে অবস্থান নেয়। হাতে লাঠিসোটা নিয়ে তারা বিক্ষোভ করতে থাকে। এতে করে ওই এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। পুলিশ এসে ঘণ্টাখানেক পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। এদিকে শ্রমিকরা যখন বাবনা মোড়ে বিক্ষোভ করছিলো তখন কদমতলী এলাকার একটি পেট্রোল পাম্পে শ্রমিকদের আরেক অংশকে নিয়ে অবস্থান নেন সেলিম আহমদ ফলিক। মঙ্গলবার বিকাল ৩টা থেকে পাল্টা বিক্ষোভের খবরে বাবনা মোড়ে থাকা শ্রমিকরা ফের বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় তারা হাতে লাঠিসোটা নিয়ে বঙ্গবীর রোড এলাকায় অবস্থান নেয়।
বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার বিকালে পরিবহন শ্রমিকদের সেলিম ও রুনু অংশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় কদমতলী এলাকার কয়েকটি বাস কাউন্টারে অফিস ভাঙচুর করা হয়। এতে অন্তত ২০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভ করে রুনু অংশের নেতারা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় গেলে ফলিক অংশের নেতারা পাল্টা আক্রমণ করে। এতে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষকালে বেশ কয়েকটি কাউন্টার ভাঙচুর করা হয়। পরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক জানিয়েছেন, তহবিল থেকে টাকা আত্মসাতের প্রশ্নই উঠে না। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে টাকা কেবলমাত্র মারা যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এই টাকাও তারা বিতরণের দাবি তুলেছিলো। এতে সম্মতি না দেয়ায় কিছু সংখ্যক শ্রমিক পরিকল্পিত ভাবে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। -মানবজমিন

