গোলাপগঞ্জে যুবকের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন: চুন ঢেলে দু’চোখ অন্ধ করে দেয়া হয়েছে
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
দেলোয়ার হোসাইন, সিলেট থেকে:
‘আমার হাত-পা ভেঙে দিলে দাও, আমায় নদীতে ফেলে দাও। তারপরও আমার চোখে চুন দিও না। আমার চোখ নষ্ট করে দিও না, আমার পৃথিবী অন্ধকার করে দিও না।’ এমন কাকুতি-মিনতিতেও রক্ষা পাননি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা দৌলতপুর গ্রামের বাছই মিয়ার পুত্র জাহেদ আহমদ। নির্যাতনকারীরা জাহেদের চোখে চুন ঢেলে দেয়, পানির জন্য চিৎকার করলে তারা পানির বদলে তাঁর মুখে চুন মিশানো পানি ঢেলে দেয়। এরপর চুন মেশানো পানি তাঁর দু’চোখে ঢেলে দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতন চালায়। আহত জাহেদ এখন ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর চোখ দু’টি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে ক্ষীণ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
স্থানীয় ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি শনিবার রাতে উপজেলার বাঘা ইউনিয়নের রস্তমপুর গ্রামের ইসহাক আলীর পুত্র রায়ুব আলী ওরফে ছানু মিয়া তার নিজ বাড়িতে তুলে নিয়ে জাহেদ আহমদকে চোখে চুন দেওয়াসহ নানাভাবে শারীরিক নির্যাতন করেন। পরদিন সকালে ডাকাত ধরেছেন বলে গোলাপগঞ্জ মডেল থানায় খবর দেন। পুলিশ খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক রস্তমপুর গ্রামে গিয়ে জাহেদকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করে এবং ছানু মিয়াকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। এ ঘটনায় রায়ুব আলী ওরফে ছানু মিয়া (৪০) নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। গত ১০ ফেব্রুয়ারি রোববার সকালে উপজেলার বাঘা ইউনিয়নের রস্তমপুর থেকে তাকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় জাহেদের পিতা বাছই মিয়া বাদী হয়ে ছানু মিয়াকে প্রধান আসামি করে একটি মামলা (মামলা নং- ০৪) দায়ের করেন।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন জাহেদ আহমদ। তাঁর চোখ দুটি প্রায় থেঁতলে গেছে। চোখের পাপড়ি মেলারও ক্ষমতা নেই। জাহেদ আহমদ সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, বাঘা রস্তমপুর গ্রামের ছানু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে হুন্ডির ব্যবসার সাথে জড়িত। তার হয়ে জাহিদ ও একই গ্রামের সহির উদ্দিনের ছেলে জুবায়ের আহমদ কাজ করতেন। বিভিন্ন জায়গায় টাকা আনা নেওয়া তাদের কাজ ছিল। গত ৩ মাস আগে সিলেটের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীরা হুন্ডির টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায়। জাহেদ বলেন, বিষয়টি সাথে সাথে ছানু মিয়াকে জানালেও তিনি টাকা ছিনতাই হয়েছে বলে বিশ্বাস করতে চাননা। এ জন্য গত ১০ ফেব্রুয়ারি রোববার রাতে ছানু মিয়া আমাকে বাড়িতে ডেকে পাঠান। আমি বাড়িতে গেলে পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে ছানু ও তার সহযোগীরা আমার মুখ ও হাত-পা বেঁধে ফেলে। প্রথমে আমাকে মারধর করে গাড়িতে তোলার কথা বলে সুরমা নদীর পারের একটি জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে ২/৩জন লোক আমার বুকের ওপর ওঠে টাকা নিয়েছি এই কথা স্বীকার করতে বলে। এসময় টানা ৩ ঘণ্টা বিভিন্নভাবে আমার ওপর তারা নির্যাতন করে।
জাহেদ আরও বলেন, যখন পানির জন্য আমি চিৎকার করি তখন তারা পানির বদলে আমার মুখে চুন মিশানো পানি ঢেলে দেয়। এরপর গাছের সাথে বেঁধে আমাকে ফেলে রেখে চলে যায়।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ওসি (অপারেশন) দেলোয়ার হোসেন জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামি ছানু মিয়ার রিমান্ড চাওয়া হবে আদালতে। এ ঘটনার সাথে আর কে কে জড়িত ছানু মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে।
এদিকে এ ঘটনায় প্রতিবাদে গত সোমবার রাতে প্রতিবাদ সভা করেছে এলাকাবাসী। সভায় তাঁরা এ ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও ছানু মিয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। অপরদিকে জাহেদ আহমদের উপর অমানুষিক নির্যাতন ও চোখে চুন দিয়ে অন্ধ করার প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার বিকেলে পৌরসভা অডিটোরিয়ামে সাংবাদিক সম্মেলন করেছে এলাকাবাসী। সাংবাদিক সম্মেলনে এলাকাবাসীর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সমাজ সেবক বাহা উদ্দিন। সাংবাদিক সম্মেলনে ছানু মিয়াসহ সহযোগীদের ফাঁসির দাবি জানানো হয়।

