নাটকীয় ছুটিতে প্রধান বিচারপতি : অসুস্থতাজনিত ছুটি, নাকি বাধ্যতামূলক?
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ অক্টোবর ২০১৭
দেশ ডেস্ক: ষোড়শ সংশোধনীর রায় প্রকাশের পরপরই তৈরি হয়েছিল উত্তাপ। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর ছিলেন সরকারি দলের নেতারা। সংসদের ভেতরে-বাইরে দাবি উঠেছিল, তার পদত্যাগের। তৈরি হয়েছিল নানা গুঞ্জন। আগস্ট মাসের পুরোটা সময় জুড়েই আলোচনায় ছিলেন প্রধান বিচারপতি। সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শুরুর পর আলোচনা-সমালোচনা কিছুটা মিইয়ে এসেছিল। এরইমধ্যে বিদেশ সফরও করে আসেন বিচারপতি সিনহা।
এক মাসের বেশি সময়কার লম্বা অবকাশ শেষে সুপ্রিম কোর্ট খোলার ঠিক আগের দিন সোমবার নিজ দপ্তরে আসেন প্রধান বিচারপতি। বলাবলি রয়েছে, এ সময় তিনি অনেকটা নাটকীয়ভাবে ছুটিতে যাবার সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এরপর দুপুর তিনটার দিকে তিনি আদালত এলাকা ত্যাগ করেন। এরআগেই খবর ছড়িয়ে পড়ে, প্রধান বিচারপতি এক মাসের ছুটিতে যাচ্ছেন। অবহিতপত্র পাঠানো হয়েছে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের কাছে। প্রধান বিচারপতির অবহিতের চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। বিকাল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে প্রধান বিচারপতির চিঠি যায় আইন মন্ত্রণালয়ে। আইনমন্ত্রী ও আইন সচিবের স্বাক্ষরের পর তা পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। একটি সূত্রে জানা গেছে, ছুটির ক্ষেত্রে অসুস্থতার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট খোলার ঠিক আগের দিন ‘নজিরবিহীনভাবে’ প্রধান বিচারপতি কেন দীর্ঘ ছুটিতে গেলেন তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট খোলার দিনে বিচারক ও আইনজীবীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথা ছিল প্রধান বিচারপতির। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, তারা শুনেছেন প্রধান বিচারপতি হঠাৎ করে ছুটির কথা জানিয়েছেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ কোনো আমলেই আদালত খোলার প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির ছুটিতে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। অন্যদিকে, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, কোনো চাপে নয়, ব্যক্তিগত কারণে ছুটি নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তবে প্রধান বিচারপতি কেন ছুটিতে গেলেন সে কারণ জানা নেই বলে মন্তব্য করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। ওদিকে, সোমবার বিকাল থেকেই রাজধানীর হেয়ার রোডের প্রধান বিচারপতির বাসভবন ঘিরে ছিলো উৎসুক মানুষের ভিড়। মিডিয়াকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাকের সদস্যদের তৎপরতা ছিল বেশ। এক পর্যায়ে সাদা রঙের একটি গাড়িতে এসে হাজির হন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদিন ও সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন। উদ্দেশ্য প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ। তবে নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ ছাড়াই ফিরে যান তারা। এসময় জয়নুল আবেদীন বলেন, দীর্ঘদিন পর সুপ্রিম কোর্ট খুলছে আগামীকাল মঙ্গলবার। কিন্তু হঠাৎ করে প্রধান বিচারপতি ছুটিতে চলে যাচ্ছেন। জাতি আজ উদ্বিগ্ন। দীর্ঘদিন ছুটি কাটিয়ে আবার কেন ছুটিতে।
চাপ দিয়ে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে ‘প্রচণ্ড চাপ’ প্রয়োগ করে একমাসের ছুটিতে যেতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। তিনি জানান, প্রধান বিচারপতির এই ছুটির রহস্য জানা এবং তা জাতির সামনে প্রকাশের চেষ্টা করবে আইনজীবী সমিতি। মঙ্গলবার সকালে সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের তৃতীয় তলায় কনফারেন্স কক্ষে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির এক জরুরি সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, আইনজীবী সমিতি মনে করে, তিনি (প্রধান বিচারপতি) যাতে একমাসের জন্য ছুটিতে চলে যান সেজন্য তার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। জাতি জানে, সারা পৃথিবীর মানুষ জানে, একটি জাজমেন্টের পরে তাকে একটি রাজনৈতিক দল, সরকার বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করছিল। আমরা মনে করি, সেই চাপের অংশ হিসেবেই সোমবার তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
আদালতে ফিরিয়ে দিতে আইনজীবীদের বিক্ষোভ
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা সুস্থ না অসুস্থ তার সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না তাকে জনসম্মুখে হাজির এবং আদালতে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করছে সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ আইনজীবীরা। বুধবার বেলা সোয়া ১টা থেকে আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতির কক্ষের সামনে প্রথমে প্রতিবাদ সভা করে। এরপর বার ভবনে বিক্ষোভ মিছিল করেন। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আবেদ রাজার সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভা শেষে আইনজীবী নেতা অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, গাজী কামরুল ইসলাম সজল, গোলাম মোঃ চৌধুরী আলাল, শরীফ ইউ আহমেদসহ শতাধিক আইনজীবী বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। প্রতিবাদ সভায় সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আইনমন্ত্রী বলেছেন প্রধান বিচারপতি ক্যন্সারে আক্রান্ত। জনগণ যানতে চায় তিনি সুস্থ না অসুস্থ। তাকে জনসম্মুখে হাজির করা হোক। আবেদ রাজা বলেন, এই প্রতিষ্ঠান (সুপ্রিম কোর্ট) নিয়ে যারা ষড়যন্ত্র করছে তাদের জনগণ উৎখাত করবে। উল্লেখ্য, সোমবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক মাসের ছুটিতে যান। তার অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞাকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়।
গৃহবন্দি করার অভিযোগ মিথ্যা- মাহবুব
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে- বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের এমন অভিযোগ সত্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, প্রধান বিচারপতির ছুটির ইস্যুতে একটি দল ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। মঙ্গলবার দুপুরে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, উনি (সুরেন্দ্র কুমার সিনহা) কী কারণ দেখিয়ে ছুটিতে গেছেন তা আইনমন্ত্রী বলেছেন। আর আমরা জানি, উনি ক্যান্সারের রোগী। আগেও উনার ক্যান্সারের ট্রিটমেন্ট হয়েছে। কাজেই এটা সম্পূর্ণ উনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তারপরও একটি রাজনৈতিক দল এ নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য দিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এগুলোর কোনো সারবত্তা নেই, কোনো রকম বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এগুলো গোচরে আনারই প্রয়োজন পড়ে না।
ছুটির আবেদনে যা বলা হয়েছে
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক মাসের ছুটি চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো তার আবেদনটি সংবাদ মাধ্যমের জন্য প্রকাশ করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। আজ সচিবালয়ে ব্রিফিংকালে আইনমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে লেখা প্রধান বিচারপতির ওই চিঠিটি প্রথমে পড়ে শোনান। পরে টিভি ক্যামেরার সামনে ওই চিঠি তিনি তুলে ধরেন এবং চিঠির ছবি তোলার অনুমতি দেন। পরে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হকের হাত থেকে সাংবাদিকরা প্রধান বিচারপতির ছুটির আবেদনের ছবি তুলে নেন। প্রধান বিচারপতির স্বাক্ষরে রাষ্ট্রপতি বরাবরে লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এর আগে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং গত বেশ কিছুদিন ধরেও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্রামের জন্য ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিন তিনি ছুটি কাটাতে চান বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

