আসা হলোনা মা-ছেলের : পাহাড়ে গুলি করে হত্যা করে সেনাবাহিনী
প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭
দেশ ডেস্ক: যুবতী মেয়েকে নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম হেঁটে পাহাড়ী ঢালু পথ দিয়ে হাঁটছিলেন শফিউল্লাহ। একই পাড়ার হাজারো রোহিঙ্গাদের সাথে হাঁটছিল তার পরিবারের ৫ সদস্য। চলার পথে বর্মী সেনাদের গুলির আতংক। গ্রাম্য পথগুলো যেন ভুতুড়ে নগর। কোন সাড়া শব্দ নেই। প্রাণে বাঁচতে পাহাড়ী পথ হয়ে আসার সময় পাহাড়ের ভেতর তাদের উপর গুলি চালায় সেনা সদস্যরা। এতে প্রাণ হারায় স্ত্রী ও ছেলে। শফি উল্লাহ জানান, গত ১লা সেপ্টেম্বর রাখাইনের বুচিডং থানার শাহাব বাজার গ্রাম থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে গ্রাম ছাড়ে তার পরিবার। স্ত্রী রোশন আক্তার (৪৭), ছেলে খালেদ হোসেন (২৫), ২ মেয়ে তসলিমা আকতার (১০) ও ইয়াছমিন আক্তার (১৮) নিয়ে শফি উল্লাহর (৫৫) সংসার। যুগ যুগ ধরে বসবাসরত ঘরটি তালা মেরে গোয়াল ঘরে ৫ টি গরু আর ২ মহিষ রেখে ঘর থেকে বের হন। পেশায় তিনি কৃষি কাজ করতেন।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শফিউল্লাহ বলেন, ২৫ আগস্ট সহিংসতা শুরু হলে আতংকে ছিলেন রোহিঙ্গা মুসলিমরা। তখন শুরু হয় মুসলিমদের উপর বর্বরতা, নির্যাতন ও হত্যা। পার্শ্ববর্তী গ্রাম গুলোতে আক্রমন করে সেনাবাহিনী ও বর্মী মগরা। প্রাণ বাঁচাতে এলাকার অনেকে পরিবারের সাথে তার পরিবারও পাহাড়ী ঢালু পথ দিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ পাহাড়ের ঢালু পথে সেনাদের উপস্থিতি। সেনারা যুবকদের আটক করছে। কিল, ঘুষি ও বুটের আঘাতে নির্যাতন চালাচ্ছে। এর মধ্যে ছেলে খালেদ হোসেনকেও আটক করে নির্যাতন চালায়। চোখের সামনে ছেলের নির্যাতন দেখে মা সহ্য করতে পারেনি। ছুটে যায় সেনাদের দিকে। ঝাপটে ধরে ছেলেকে। মুহুর্তে গুলি করে হত্যা করে মা-ছেলেকে। গুলির শব্দে দিগি¦দিক পালিয়ে যায় দল বেঁধে আসা রোহিঙ্গারা। পালানোর সময় সেনাদের গুলিতে কয়েকজন নারী পুরুষ ও শিশু প্রাণ হারায়। কিন্তু নিজেদের প্রাণ রক্ষার্থে আপনজনদের মৃত মুখটিও দেখতে পারেনি। অন্যান্যদের সাথে শিশু মেয়সহ যুবতী মেয়েকে নিয়ে পালাতে থাকে শফিউল্লাহ। সন্ধ্যা নেমে আসলে শতাধিক রোহিঙ্গা জড়ো হয়ে পাহাড়ে নির্ঘুম রাত কাটায়। বাকীরা কে কোথায় আর দেখা হয়নি। অনেকে স্বজন হারানোর ফলে গুমরে কাঁদছে। তাদের মধ্যে তিনিও রয়েছেন।
১৭ সেপ্টেম্বর রোববার এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে গিয়ে ছোট মেয়ে তসলিমাকে ঝাপটে ধরে কেঁদে ওঠেন শফিউল্লাহ। তখন ছোট মেয়েটির চোখ ছল ছল করছে। হয়তো কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা। অন্যদিকে ১৭ দিন ধরে অভুক্ত অবস্থায় পথ চলা। হাড্ডিসার ও ক্লান্ত শরীরে মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছেনা সফিউল্লাহসহ অন্যদের।
তিনি আরো জানান, দূর্গম পাহাড় অতিক্রম করতে গিয়ে সেনাদের আক্রমনে এদিক সেদিক পালিয়ে যাওয়ায় পথ হারিয়ে ফেলে শফিউল্লাহসহ শতাধিক রোহিঙ্গারা। সারাদিন হাঁটে আর রাতে পাহারা দেয়। সকালে উঠে ফের যাত্রা শুরু করেন তারা। কিন্তু অপরিচিত এতোবড় পাহাড়ে পথ খুঁজে পায়না। এসময় তারা পাহাড়ে লতা, পাতা ও ফলমুল খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন। তিনি বলেন, পথে পথে এলোপাতাড়ি নারী শিশু ও যুবকের লাশ দেখতে পাই। কিন্তু সেদিকে চাওয়ার সময় কারো নেই। নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে ছুটেছেন তারা। একপর্যায় ১৪ দিন পর গ্রামের দেখা পান তারা। একসময় পৌঁছে যান সীমান্তে। সেখানে তিন দিন নৌকার জন্য অবস্থান করে অবশেষে শফিউল্লাহসহ অন্যান্য শতাধিক রোহিঙ্গা শনিবার শাহপরীরদ্বীপ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ১৭ দিন অভুক্ত থাকার পর বাংলাদেশে এসে তিনি পেট ভরে ভাত খেতে পারেন বলে জানান শফিউল্লাহ। তার সঙ্গে আসা অন্য রোহিঙ্গারাও সেদিনই ভাত খান।
শফিউল্লাহ এখন এক যুবতী মেয়ে ও ১০ বছরের এক শিশু মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাবে জানেননা। স্ত্রী ও একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা তিনি। মা-ভাইকে হারিয়ে নির্বাক মেয়েরা। শান্তনা দেওয়ার ভাষা কারো জানা নেই। কে কাকে শান্তনা দিবে।
শুধু শফিউল্লাহর পরিবারে এমন ঘটনা ঘটেছে তা নয়। এ ধরণের হৃদয় বিদারক ঘটনা হাজার হাজার রোহিঙ্গার পরিবারেই রয়েছে। ওইসব স্বজনদের শোকে রোহিঙ্গাদের হৃদয় পাথুরে হয়ে গেছে। কেঁদে কেঁদে চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে। সূত্র: মানবজমিন

