ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তা : পাউন্ডের মূল্যপতন
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ আগস্ট ২০১৭
০ইউরোর কাছে পাউন্ডের শোচনীয় হার ০যুক্তরাজ্য ছাড়ছেন ইউরোপীয়ানরা ০বাংলাদেশী রেমিটেন্স মার্কেটে ধ্বস oদুই বছর পর্যন্ত টাকার রেইট বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম
দেশ রিপোর্ট, ২৫ আগস্ট : ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বৃটেনের ফাইন্যানশিয়াল মার্কেটে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিশ্ববাজারে পাউন্ডের মূল্যপতন ঘটছে প্রতিদিন। ব্রেক্সিটের আগে যেখানে ১ পাউন্ডের বিপরীতে ডলারের মূল্য ছিলো ১.৫০ সেখানে ব্রেক্সিটের পরে মুল্যপতন ঘটতে ঘটতে চলতি সপ্তাহে নেমে এসেছে ১.২৮ ডলারে। আর ইউরোর কাছে পাউন্ডের মূল্যপতন ঘটেছে অস্বাভাবিক হারে। চলতি সপ্তাহে পাউন্ডের বিপরীতে ইউরোর মুল্য দাড়িয়েছে ১.০৮। ফলে ব্রিটিশ হলিডে মেকারদের ইউরোপের হোটেল, রেস্তোরাঁ, শপিংমলে অতিরিক্ত পাউন্ড খরচ করতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের ভবিষ্যতবাণী অনুযায়ী আরো কিছুদিনের মধ্যে পাউন্ড ও ইউরোর মুল্য সমান হয়ে যেতে পারে।
এদিকে ব্রেক্সিটের আগের দিন পর্যন্ত ১ পাউন্ডের বিপরীতে টাকার মুল্য ছিলো ১১০। কিন্তু ব্রেক্সিটের পরদিনই হ্রাস পেয়ে হয়ে যায় ১০৫ টাকা। এরই মধ্যে একদফা টাকার মূল্য নেমে ৯৫ টাকায় স্থির হয়। তারপর থেকে ১০০ থেকে ১০৫ টাকার মধ্যেই উঠানামা করছে। পাউন্ডের মুল্য পতনের সাথে সাথেই বাংলাদেশী মুদ্রার মুল্যপতন ঘটতে থাকে।
টাকার মুল্য কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশী রেমিটেন্স মার্কেটেও ধ্বস নামছে। প্রতিবছর ঈদুল হাজার এলে প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেশে একাধিক কুরবানী দেয়াসহ নানা কারণে পরিবার পরিজনের জন্য টাকা পাঠান। কিন্তু রেইট কমে যাওয়ার কারণে খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ টাকা পাঠাচ্ছে না।
পূর্ব লন্ডনের হোয়াটচ্যাপেল রোডে অবস্থিত মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান ‘বিএ এক্সচেইঞ্জ’র সিইও ও নাইটসব্রিজ ট্রেডিং একাডেমির সিনিয়র এডুকেটর এবিএম কামরুল হুদা আজাদ সাপ্তাহিক দেশকে বলেন, ব্রেক্সিটের পর থেকেই রেমিটেন্স মার্কেটে অস্থিরতা বিরাজ করছে। মানুষ খুব জরুরী দরকার না হলে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেনা। একেবারে যা না পাঠালেই নয়, শুধু তাই পাঠাচ্ছেন। প্রবাসীরা মানি ট্রান্সফার হাউজগুলোতে টাকার রেইট জানতে আসেন, কিন্তু রেমিটেন্স পাঠান খুম কম। প্রত্যেকেই অপেক্ষায় আছেন কবে রেইট বৃদ্ধি পাবেন। তবে কামরুল হুদা আজাদ বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়না আগামী দুই বছরের মধ্যে রেমিটেন্স মার্কেটের অস্থিরতা দূর হবে। তিনি বলেন, তাঁর পর্যবেক্ষন মতে আগামী দুই বছর পর্যন্ত টাকার রেইট ১১০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যেই উঠানামা করবে। এরচেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই।
তিনি আরো বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী টোনি ব্লেয়ারের বক্তব্য রেমিটেন্স মার্কেটকে আরো অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। টোনি ব্লেয়ার বলেছেন, ব্রেক্সিটের নেতিবাচক দিকগুলো বৃটেনের জনগনের কাছে তুলে ধরে আবারও গণভোট দেয়া উচিত। তাহলে দেখা যাবে জনগন আর ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দেবেনা। তাঁর এই বক্তব্য ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ায় অনিশ্চতা ডেকে আনছে। জানা গেছে, চলতি সপ্তাহে সিঙ্গেল মার্কেটে ইউরোপ ম্যানুফ্যাকচারিংসহ এক্সপোর্ট ডাটা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি বাজারে পাউন্ডের দর পতনের অন্যতম কারণ। বর্তমানে সরকার আনুষ্ঠানিক ব্রেক্সিট আলোচনা এবং সেজন্য কিছু কিছু সমঝোতার ভিত্তিতে বেশ কিছু পেপার প্রকাশ করেছে। কিন্তু সেই উন্নয়নও বাজারে পাউন্ডের পতন ঠেকাতে পারেনি।
যুক্তরাজ্য ছাড়ছেন ইউরোপীয়ানরা: এদিকে ব্রেক্সিটের পর থেকে ব্রিটেনে ইমিগ্রেন্টদের সংখ্যা উল্লেখ্যযোগ্য হারে কমতে শুরু করেছে। গত তিন বছরের মধ্যে বর্তমানে ব্রিটেনে ইমিগ্রেন্টদের সংখ্যা সবেচেয়ে কম। এর প্রধান কারণ হিসেবে ব্রেক্সিটের পর ইউরোপের ৮টি দেশের নাগরিক অনিশ্চিত অবস্থার কথা বিবেচনা করে ব্রিটেন ছাড়ছেন বলে মনে করা হচ্ছে। যার ফলে ব্রিটেনের নেট মাইগ্রেশন গত কোয়ার্টারে ২ লাখ ৪৬ হাজার হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছে অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক বা ওএনএস। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ব্রেক্সিটের অনিশ্চয়তার কারণে ইউরোপিয়ানরা ব্রিটেন থেকে চলে যাচ্ছেন। যার ফলে এমন নাটকীয়ভাবে নেট মাইগ্রেশন কমে আসছে। থাকার জন্য এসেছিলেন এমন ৮১ হাজার ইউরোপিয়ান ব্রিটেন ছেড়েছেন। ওএনএস এই অবস্থাকে পরিসংখ্যানগতভাবে সিগনিফিক্যান্ট পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিগত মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে ইউরোপ থেকে নেট মাইগ্রেশনের টার্গেট ছিলো ১লাখ ২৭ হাজার, সেখানে গত বছর নেমে দাড়িয়েছে ৫১ হাজার এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে নেমেছে ১৪ হাজার । ওএনএস তাদের পরিসংখ্যানে আরো দেখিয়েছে, এইভাবে মাইগ্র্যাশন নেমে ইইউর নাগরিক ব্রিটেন ছেড়েছেন ৩৩ হাজার ।
এদিকে ইউরোপিয়ানদের বৃটেন ত্যাগের ফলে এখানকার প্রপার্টি মার্কেটে ভাড়া কমে যাচ্ছে। আগে যেখানে পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রীন কিংবা স্টেপনী ও মাইল অ্যাণ্ড এলাকায় একটি তিন বেডরুমের ন্যূনতম মাসিক ভাড়া ছিলো ২৫/২৬ পাউন্ড। এখন তা কমে দাড়িয়েছে ২১/২২শ পাউন্ড। এতে করে ল্যান্ডলর্ডরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সুবিধাভোগ করছে যারা ভাড়া থাকেন।

