রক্তনদী বয়ে এলো গণঅভ্যুত্থান
প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ আগস্ট ২০২৫
দেশ ডেস্ক:: চব্বিশের গণঅভ্যুথানে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। এটি বাংলাদেশ ও একুশ শতকের বিশ্বরাজনৈতিক-ইতিহাসের এক অনন্য-অনবদ্য ঘটনা। আমাদের সামন্তবাদী-রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিগত হাসিনা সরকারের সুদীর্ঘ কর্তৃত্বতান্ত্রিক শাসন সৃষ্টি করেছিল সুতীব্র বৈষম্য আর সুগভীর বঞ্চনা। কায়েম করা হয়েছিল পুলিশি রাষ্ট্র, গুম-খুন-অর্থ পাচার-ত্রাসের রাজত্ব। লাগাম টানা হয়েছিল সংবাদমাধ্যম ও জনগণের মত প্রকাশের অধিকারে। সব মিলে জান ও জবানের স্বাধীনতায় তীব্র আঘাত এসেছিল, চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছিল নাগরিকের মর্যাদা আর তার অধিকার। সে কারণেই বৈষম্য আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল গত বছরের জুলাইয়ে। ঘটেছিল গণবিদ্রোহের গণবিস্ফোরণ।
ফরাসি দার্শনিক আলবেয়ার কামু মনে করতেন, এই বিদ্রোহ মানুষের অস্তিত্বশীলতার প্রশ্ন। আমরা বিদ্রোহ করি বলেই আমরা টিকে থাকি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। হাসিনা যুগের কর্তৃত্ববাদী শাসনে পিষ্ট দেশের বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-শ্রেণি-পেশা-লিঙ্গের মানুষ অস্তিত্বের প্রয়োজনেই বিদ্রোহে শামিল হয়েছিল।
ফরাসি উপনিবেশে জন্ম নেওয়া সুবিখ্যাত চিন্তাবিদ ফ্রানৎস ফানো মনে করতেন, কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতি নয়, বরং নানা কারণেই মানুষ বিদ্রোহ করে, যখন কি না মানুষের দম বন্ধ হয়ে ওঠার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। তার কাছ থেকে আমরা শিখেছি, যখন দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি জনগোষ্ঠীর আশা ও স্বপ্নকে দাবিয়ে রাখে তখন সেই জনগোষ্ঠী বিদ্রোহকে জীবনের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত পথ হিসেবে বেছে নেয়।
শেখ হাসিনার দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধেও রাস্তায় ঢল নেমেছিল স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের। কণ্ঠে তারা ধারণ করেছিল দীপ্ত সেøাগান। চোখে-মুখে নিপীড়ন ও বঞ্চনাবিরোধী প্রত্যয়। স্বৈরাচার হটাতে পথে নেমেছিল নারী-পুরুষ, হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ, শহর থেকে গ্রাম, বাঙালি থেকে আদিবাসী, তরুণ থেকে পথশিশু, বৃদ্ধ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী-বুদ্ধিজীবী-রিকশাচালক, শ্রমিক-ব্যাংকার-পেশাজীবী-সাংবাদিকসহ সব শ্রেণি-বর্গ-লিঙ্গ-পেশার মানুষ। জুলাইয়ের ছাত্র নেতৃত্ব ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক-মতাদর্শিক বিরোধকে পেছনে ফেলে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক বাস্তবতাকে, মানুষে মানুষে সংগ্রামের ঐক্যকে সম্ভব করে তুলতে পেরেছিল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মর্মমূলে ছিল মূলত দুটি আকাক্সক্ষা। প্রথমত, স্বৈরাচার হটানো। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে বৈষম্যহীন মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা। এই দুই আকাক্সক্ষা মূর্ত হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানের বয়ানে (ন্যারেটিভে); বক্তৃতায়-স্লোগানে-পোস্টারে-গ্রাফিতিতে। ‘বিকল্প কে, আমি-তুমি-আমরা’, কিংবা ‘শোনো মহাজন, আমরা অনেকজন’ কিংবা ‘এদেশ তোমার-আমার সবার’ কিংবা ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’ কিংবা ‘রাষ্ট্র সংস্কার লাগবে’ জাতীয় ভাষ্য উঠে আসে এসব বয়ানে। এখন প্রশ্ন হলো : কোটা সংস্কারের একটি আন্দোলন কী করে একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার হটাতে সমর্থ হলো। উত্তর খুঁজে পেতে আমাদের যেতে হবে ঘটনার আরও খানিকটা গভীরে।
পাঠক মনে করে দেখুন বিগত কর্তৃত্ববাদী হাসিনা সরকারের শাসনামল। নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যা, ক্রসফায়ারের শিকার টেকনাফের এক পৌর কাউন্সিলর একরামুল হকের শিশু সন্তানের আর্তনাদ ‘আব্বু তুমি কান্না করছ যে’, বিশ্বজিৎ কিংবা আরবাব ফাহাদের হত্যাকাণ্ড, ইলিয়াস আলীসহ অনেক রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীকে গুম করে ফেলার মতো বহু বহু ঘটনা মানুষের সম্মিলিত স্মৃতিতে জাগরিত। সড়কে-কারখানায় কাঠামোগত মৃত্যুর মিছিলও ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। আর এসব ক্ষেত্রে বিগত হাসিনা সরকারকে সবথেকে বেশি চ্যালেঞ্জে ফেলেছিল শিশু-কিশোর-তরুণরা। আর এর প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিরোধ রচনা হয়েছিল ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’র মধ্য দিয়ে।
২০১৮ সালের শিশু-কিশোরদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন শুরু হয়েছিল সড়কে দুই সহপাঠীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। সেই আন্দোলনের একটি স্লোগান ছিল ‘লাইসেন্স লাগবে’। এই লাইসেন্স প্রশ্ন ড্রাইভিং লাইসেন্সে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং তা রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতীক হয়ে ওঠে। ওই সময় শিক্ষার্থীরা মন্ত্রী-এমপি মানেনি, ভিআইপি কালচার মানেনি, অবাধ্যতার জোয়ার নামিয়ে তারা অচল করে দিয়েছিল রাজধানী ঢাকাকে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে তারা দাবি করেছিল কার্যকর সংস্কার। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও শেখ হাসিনার দলীয় বাহিনী মিলে শিক্ষার্থীদর সেই যৌক্তিক ও নৈতিক আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমন করেছিল। এর আগে ২০১৩ সালেও কোটা সংস্কারে সংঘটিত আন্দোলন বলপ্রয়োগে নস্যাৎ করেছিল হাসিনা সরকার। সড়ক আন্দোলনের বছরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালে আবারও একবার কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে ওই বছরের ৪ অক্টোবর মন্ত্রিসভা থেকে সরকারি চাকরিতে নবম গ্রেড থেকে একেবারে ১৩তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে পরিপত্র জারি করা হয়। আবার ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি আগের পরিপত্র বহাল রেখে অষ্টম গ্রেডে ও তার উপরের পদেও কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে আরেকটি পরিপত্র জারি করা হয়। পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা সন্তান উচ্চ আদালতে আবেদন করেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই পূর্ণাঙ্গ পরিপত্রটি ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট থেকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এতে পুরোনো কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়। এই রায়ের কারণেই রাস্তায় নেমে আসে শিক্ষার্থীরা, যা এক পর্যায়ে সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। সেই বিধি অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে প্রতি ১০০ পদের মধ্যে ২০টি মেধার ভিত্তিতে, ৪০টি জেলাভিত্তিক আর ৩০টি আসন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের জন্য বরাদ্দ থাকবে। এ ছাড়াও ১০টি পদ থাকবে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য। পরবর্র্তী সময়ে বেশ কয়েকবার এই কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তন করা হয়। পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সবশেষে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময় সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে বিভিন্ন কোটায় বরাদ্দ ছিল ৫৫ শতাংশের বেশি, যার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া জেলাভিত্তিক ১০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের জন্য ছিল ১ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ জন চাকরি প্রার্থী পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৪৪ জন মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ ছিল। বাকি ৫৬টি আসন চলে যেত বিভিন্ন কোটায়।
চব্বিশে কোটা পুনর্বহালের রায়ের পর শিক্ষার্থীরা আবারও রাস্তায় নেমে আসেন। একই সঙ্গে সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। রায়ের দিনই সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সমবেত হন শিক্ষার্থীরা। রাত ৮টায় একটি মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা রাজু ভার্স্কযের পাদদেশে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। বিক্ষোভ মিছিলে শিক্ষার্থীরা সেøাগান দেন, ‘কোটা পদ্ধতি মানি না / হাইকোটের রায় মানি না/ কোটা বাতিল করো, করতে হবে। এই বিক্ষোভ সমাবেশে ঢাবি শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা ২০১৮ সালে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। আমরা তখন রক্ত দিয়েছি। সেই কারণে সরকার কোটা বাতিল করেছিল। কিন্তু আবারও আজ হাইকোট সেই কোটা পুনর্বহাল করেছে। আমরা এই রায়কে প্রত্যাখ্যান করছি। বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে কোটা আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
পরদিন আবার রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। তবে কুরবানি ঈদের কারণে আন্দোলন কিছু দিন স্থগিত রাখা হয়। দীর্ঘ ২৪ দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলার পর এবার শিক্ষক-কর্মকর্তারা সর্বজনীন পেনশন প্রত্যয় স্কিমবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। অন্যদিকে শিক্ষাথীরা শুরু করেন তাদের কোটাবিরোধী আন্দোলন। শিক্ষার্র্থীরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে পর্যায়ক্রমে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে চলতে থাকে পদযাত্রা ও বিক্ষোভ মিছিল। একসময় শাহবাগ মুখরিত হয়ে ওঠে নানা সেøাগানে। আবার একই সঙ্গে বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ। শিক্ষার্থীরা বাংলা ব্লকেড নামে নতুন কর্মসূচির ডাক দেন। ঢাকা শহর হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের শহর। তবে এর মধ্যে কোটা পুনর্বহাল সংক্রান্ত হাইকোটের রায় স্থগিত চেয়ে দুই শিক্ষার্থী আবেদন করেন। এই আবেদনের ভিত্তিতে শুনানি হয় আপিল বিভাগে। কিন্তু শুনানি শেষে ৪ সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা দেওয়া হয়। কিন্তু আন্দোলন আরও ফুঁসে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সারা দেশে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে যেন ঘি ঢেলে দেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা চাকরি পাবে না তো কি রাজাকারের নাতিপুতিরা চাকরি পাবে? এই মন্তব্য বিস্ফোরক ও বারুদ হয়ে জ¦লে ওঠে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এটি দমাতে সরকার আবারও পুরোনো কৌশল নেয়। প্রথমে ভাড়াটে হেলমেট বাহিনী দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর চালায় নিপীড়ন। তারা ছাত্রাবাস থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে দেয়, রাস্তায় সশস্ত্র হামলা চালায়। এর পাশাপাশি মাঠে নামে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব। হেলমেট বাহিনী আন্দোলনকারীদের পেটায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দাঁড়িয়ে হামলাকারীদের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। জনসম্পৃৃক্ততা বেড়ে যাওয়ার ফলে এক পর্যায়ে এটি প্রচণ্ড গণবিদ্রোহে রূপ নেয়।
চব্বিশের জুলাইয়ে বাংলাদেশ নামের এই জনপদে আসলে এক অন্যরকম বৃষ্টি নেমেছিল। প্রাকৃতিক বৃষ্টি নয় কেবল, ফ্যাসিস্ট হাসিনা রেজিমের গণহত্যার বিপরীতে গণউত্থান (পিপলস আপরাইজিং) আর গণ-অবাধ্যতাও (সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স) যেন বৃষ্টি হয়ে ঝরেছিল। আবু সাঈদ কিংবা মুগ্ধ, প্রিয় কিংবা আনাস; এমন সহস্রাধিক শিশু-কিশোর-তরুণের রক্তবৃষ্টিতে স্নান করেছিল এই জনপদ। সেই সময় ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ কর্মকর্তার ফাঁস হওয়া ভিডিওর কথা মনে আছে নিশ্চয়? যেখানে পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘গুলি করলে মরে একটা, আহত হয় একটা, একটাই যায় স্যার, বাকিরা যায় না। এটাই স্যার সবচেয়ে আতঙ্কের।’ তারও আগে এই বাস্তবতা প্রকাশ্যে আনে নজিরবিহীন অভ্যুত্থানের সবথেকে প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ ফোর্স ছাত্ররা। কেননা তারা সেøাগান তুলেছিল : ‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ আর আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল বুলেটের সামনে। সাদরে বরণ করেছিল সর্ব-স্বৈরতন্ত্রের গুলি। সে কারণেই গণঅভ্যুত্থান সম্ভব হয়েছিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কেবল সমকালীন ঘটনা নয়, কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধ আসলে বিশ্ব-ইতিহাসেই ২১ শতকের নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থান আমাদের শেখায় যে, ইতিহাস কখনো শুধু ঘটনা দিয়ে লেখা হয় না। লেখা হয় মানুষের সাহস দিয়ে। প্রতিরোধ আর সত্য-ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি কণ্ঠ দিয়ে।
কোটা আন্দোলন হয়েছিল ৩ বার। তৃতীয় দফায় এসে এই আন্দোলন দমাতে পারেনি ফ্যাসিস্ট সরকার। বরং এই আন্দোলন ভিন্ন রূপে সারা দেশের মানুষকে রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করেছিল। জুলাই-আগস্ট মাসে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। এর পেছনে কাজ করেছে ফ্যাসিস্ট সরকারের দীর্ঘদিনের জুলুম। মানুষের সম্মিলিত চৈতন্যে থাকা ক্ষত জেগে উঠেছিল বলেই তারা রাস্তায় এসেছিল।
ইংরেজিতে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে। তা হলো : একটি বুলেট যখন বন্দুকের নল থেকে বের হয় সেটার ওপর কারও নাম লেখা থাকে না। কিন্তু যখন সেই বুলেট একজন ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রের বুক ভেদ করে, সেই বুলেটই হয়ে ওঠে ইতিহাসের রচয়িতা। সেই বুলেটকে আপনি বলতে পারেন একটি অন্যায্য রাষ্ট্রযন্ত্রের ডেথ ওয়ারেন্ট। যখন রাষ্ট্রীয় বন্দুকের সামনে বুক পেতে দেওয়া একজন নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীকে ঠান্ডা মাথায় রাজপথে হত্যা করা হয়, আর তা মানুষ যদি ক্যামেরাবন্দি করে ফেলে তখন রাষ্ট্রের জুলুম মজলুম নাগরিকদের বিদ্রোহের চৈতন্যকে ভয়াবহভাবে উসকে দেয়। গত বছরের জুলাইয়ে তাই ঘটেছিল।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ জুলুম মানুষ রুখে দিয়েছিল অভ্যুত্থানে। বিস্ফোরণ ঘটেছিল দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভের। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া ছিল আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সরকার হয়তো মনে করেছিল, ইন্টারনেট বন্ধ রাখলেই আন্দোলন স্থিমিত হয়ে যাবে। বরং ইন্টারনেট শাটডাউন আন্দোলনকে অফলাইনে রূপান্তরের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। কৌশলী ছাত্রনেতৃত্বের দক্ষতায় ক্ষোভ আর বিদ্রোহ পেয়েছিল যথাযথ গতিমুখ। কৌশলগত অরাজনৈতিক আন্দোলন এভাবেই গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল।
ছাত্র নেতৃত্বের এক দফার ঘোষণা থেকেই হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছিল। তবে নেতৃত্ব এমন ঘোষণা না দিলেও মানুষ নিজেরাই একদফার পথ বেছে নিত। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ এ ক্ষেত্রে নিয়ামকের ভূমিকায় ছিল। মৃত্যুগুলো আন্দোলনকে ঝিমিয়ে পড়তে দেয়নি, বরং আরও শক্তিশালী করেছে। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত অনুপম দেবাশীষ রায়ের একটি বই : বিদ্রোহ থেকে বিপ্লব। এই বইতে লেখা হয়েছে, জুলাইয়ে নাড়ি পোতা হয়েছিল দেশের দুঃসহ বাস্তবতা পরিবর্তনের। জুলাই শুরু হয়েছে অনেক আগেই। তাই এটি কেবল গবেষণার বিষয় নয়, জাতিগত উপলব্ধি ও মর্মবোধের প্রশ্ন। সূত্র : সময়ের আলো

