ইরাকে চার মাসে ১০ বাংলাদেশিকে অপহরণ করে কোটি টাকা মুক্তিপণ
প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ আগস্ট ২০২৩
দেশ ডেস্ক:: ঢাকার নবাবগঞ্জের দড়িকান্দা গ্রামের তোতা মিয়ার ছেলে মোসলেম মোল্লা পরিবারের স্বচ্ছলতার আশায় ২০১৬ সালে ইরাকে যান। ইরাকের সাইদিয়া শহরে থাকতেন তিনি। ২০২১ সালের শুরুতে হঠাৎ চাকরি হারান তিনি। বেকার অবস্থায় তিনি যখন চাকরি খুঁজছিলেন তখন এক বিকেলে পরিচয় হয় সেলিম নামের এক বাংলাদেশির সঙ্গে।
সেলিমের কাছে চাকরির জন্য অনুরোধ করেন মোসলেম। এই সুযোগে মাসিক ৫০০ ইউএস ডলারে অফিস সহকারীর চাকরির লোভ দেখান সেলিম। চাকরির সাক্ষাৎকারের কথা বলে ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি মোসলেমকে তিনি সাইদিয়া শহর থেকে ৫০ কি.মি দুরে আল মনসুর বা কাবাদ শহরে পাঠান। একটি প্রাইভেট কারে করে মোসলেমকে নেওয়া হয় আল মনসুর শহরের একটি বাড়িতে।
সেখানে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পরই মোসলেম বুঝতে পারেন তিনি অপহরণের শিকার হয়েছেন। সেখানে একটি ফ্ল্যাটে চার মাস বন্দি ছিলেন মোসলেম।
মোসলেম জানান, এই চার মাসে তিনি ছাড়াও ৯ বাংলাদেশিকে একইভাবে অপহরণ করে নির্যাতন করে অন্তত কোটি টাকা আদায় করেছে ওই চক্র। তারাও অধিকাংশই বেকার ছিল। কেউ আবার ভালো বেতনের আশায় সেখানে এসেছিল।
ভুক্তভোগী ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সূত্রে জানা গেছে, ইরাকের আল মনসুর শহরে আবাসিক ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরই অসাধু এক চক্র রমরমা অপহরণ-মুক্তিপণ বাণিজ্য চালাচ্ছে। বেকার বা ভালো বেতনে চাকরী খুঁজছেন এমন বাংলাদেশিদের টার্গেট করছে চক্রটি। অপহরণকৃতদের নির্মম নির্যাতন করে সে দৃশ্য ভিডিও করে দেশে স্বজনদের পাঠিয়ে মুক্তিপণ আদায় করছে। অনেক ক্ষেত্রে আবার মুক্তিপণের টাকা দিলেও মিলছেনা মুক্তি। ২০২১ সালের শুরুর দিকে মাত্র চার মসে ১০ বাংলাদেশিকে তারা অপহরণ করে কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। চক্রটি মুক্তিপণের টাকা নিচ্ছে তাদের দেশে থাকা স্বজনদের মাধ্যমে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে অপহরণের টাকা।
জানা যায়, ভুক্তভোগী মোসলেমের মায়ের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা নিলেও মুক্তি দেয়নি মোসলেমকে। মুক্তি না দিয়ে আরো টাকা দাবি করে চক্রটি। চার মাস আটকা থাকার পর সুযোগ পেয়ে সেই বন্দি দশা থেকে পালান মোসলেম। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছেন।
মোসলেম আজ সোমবার মুঠোফোনে ভয়াবহ সেই ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, আমাকে যে ফ্ল্যাটে আটকে রেখেছিল সেটি ছিল দুই রুমের। ভবনটি ছিল দুই তলা বিশিষ্ট। অপহরণকারীদের মধ্যে ছয় জন ছিল পুরুষ ও একজন নারী। চক্রের ওই নারী সদস্য অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতো। তারা সকলেই বাংলাদেশি। আমি গিয়ে প্রথম পর্যায়ে আরো তিন জনকে দেখেছি যাদেরকে একই ভাবে চাকরির কথা বলে অপহরণ করেছে। এর মাস দুই পর তাদের স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এর পর আরো ৬ জনকে এনে আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করতে থাকে। যেদিন সেখান থেকে পালিয়েছিলাম সেদিন আরো কয়েকজনকে আনতে গিয়েছিল তারা। এ সময় অপহরণকারী চক্রের মাত্র দুইজন ফ্ল্যাটে ছিল। আমরা তাদের হাত পা বেধে রেখে ভবনের ছাদ টপকে পালাতে সক্ষম হই।
মোসলেমের মা খতেজা বেগমের করা মামলার তদন্তে নেমে বাংলাদেশ থেকে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, আলী হোসেন, মো. শামীম, শিরিন সুলতানা, মোহাম্মদ ঘরামী, রবিউল ঘরামী, শাহিদা বেগম, সাহনাজ আক্তার লিপি ও মো. আকবর সরদার। তারা সবাই অপহরণকারী চক্রের স্বজন যারা দেশ থেকে অপহরণরে টাকা গ্রহণ করে।
২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত বরিশাল, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ, মাগুরা এবং খুলনায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে মূল অপহরণকারীরা এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার এসআই একেএম সামসুল আলম বলেন, মূল অপহরণকারীরা ইরাকে রয়েছে। যাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে মুক্তিপণের টাকা আদায় করেছে তাদের আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তারা টাকা নেওয়ার কথা স্বীকারও করেছে।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা বলেন বলেন, ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি মোসলেম মোল্লা ইরাকে অবস্থানকালে সেলিম মিয়া ও শামীমসহ অজ্ঞাত পরিচয়ের আরো কয়েকজনের হাত অপহরণের শিকার হন। মোসলেমকে কাজের কথা বলে ইরাকে তার বর্তমান কর্মস্থল থেকে অন্যত্র অপহরণ করে তার মা খতেজা বেগমের কাছ মুক্তিপণ দাবি করে। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য আসামিদের দেওয়া ১২ টি বিকাশ নম্বরে ২৬ বারে ছয় লাখ টাকা দেন তিনি। পরে তারা মোসলেমকে মুক্তি না দিয়ে পুনরায় তার মায়ের কাছে টাকা দাবি করে। এই ঘটনায় খতেজা বেগম বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় মামলা করেন। পরবর্তীতে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে পিবিআই ঢাকা জেলা মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে।
মো. কুদরত-ই-খুদা বলেন, তদন্তে জানা গেছে অপহরণকারীরা মুসলেমকে আটকে রেখে তার কাছে থাকা প্রায় ২ লাখ টাকা ও দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি আইফোন ছিনিয়ে নেয়। এরপর থেকে তাকে নির্যাতন করতে থাকে। তিন দিন ধরে নির্মম, বর্বর নির্যাতনের পর সেই নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও করে তা মোসলেমের মা খতেজা বেগমকে পাঠায় এবং ১১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবী করে। খতেজা বেগম ছেলের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আসামিদের পাঠানো ১২ টি বিকাশ নম্বরে ২৬ টি ট্রানজেকশনের মাধ্যমে মোট ছয় রাখ টাকা পাঠায়।
তিনি বলেন, আসামি আনোয়ার, শাহনেওয়াজ, রুহুল আমিন, মনির, হাসিবুর, সাব্বিররা ইরাকে অবস্থান করলেও দেশে তাদের পরিবারের সদস্যরা এই মুক্তিপণের টাকা বিভিন্ন বিকাশ এজেন্টের দোকান ও নিজেদের পারসোনাল বিকাশ নম্বর থেকে ক্যাশ আউট করে নেয়। শাহনেওয়াজ অপহরণ চক্রের দলনেতা বলে গ্রেপ্তাররকৃতরা জানায়। গ্রেপ্তারকৃত ৮ জন আসামিকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে ৬ জন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। জবানবন্দি অনুযায়ী ইরাকে অবস্থানকারী মামলার আসামি আনোয়ার, মনির, রুহুল আমিন, সাব্বির, শাহনেওয়াজ, হাসিবুর ও সোহাগকে সনাক্ত করা হয়। খবর-দেশ রূপান্তর

