মার্কিন ভিসা নীতি সরকারের অবাধ নির্বাচন অঙ্গীকারের সম্পূরক : প্রধানমন্ত্রীকে আজরা জেয়া
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ জুলাই ২০২৩
দেশ ডেস্ক:: অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকারের সম্পূরক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সফররত মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি আজরা জেয়া। গতকাল গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি এ কথা জানান। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময়ই দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য লড়াই করেছি এবং এরই মধ্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করেছি।’
আজরা জেয়া বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকারকে সহায়তা করতে তার দেশ নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে। কোনো দলের প্রতি আমাদের কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই।’
শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে ছাত্রজীবন থেকে এবং বঙ্গবন্ধু পরিবার ও আওয়ামী লীগ জনগণের অধিকারের জন্য সবসময়ই লড়াই করেছে।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা সবসময়ই জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকারের জন্য লড়াই করেছি। বিএনপিই দেশে ভোট কারচুপি শুরু করেছিল, যা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তন করেছে। নির্বাচনের জন্য স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স চালু করা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী ২০১৩-১৫ সালে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের নৃশংসতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগের কথা স্মরণ করেন। বৈঠকে তিনি তার ওপর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথাও উল্লেখ করেন, যখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে তাকে রক্ষা করেছিলেন।
মার্কিন এ আন্ডার সেক্রেটারি জানিয়েছেন, তিনি এরই মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা জোরদার করার ওপরও জোর দেন। আজরা জেয়া উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপারেশনাল খরচের জন্য প্রায় ৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার দেবে।
বাংলাদেশে এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য আজরা জেয়া শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘তার দেশ বাংলাদেশের আর্থিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা করবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে দেশের দুটি ভিন্ন স্থানে ১০ লাখের বেশিসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে। কিন্তু শিবিরগুলোয় এখন মানব পাচার ও অসামাজিক কার্যকলাপ হচ্ছে, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য খুবই উদ্বেগজনক।’
শ্রম ইস্যু নিয়ে কথা বলার সময় আজরা জেয়া বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র শ্রম সংস্কার উদ্যোগে বাংলাদেশের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে।’
এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা জানান, শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে শিল্প মালিকদের উদ্বুদ্ধ করেছেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) সচিব মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস উপস্থিত ছিলেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর এক টুইটে বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা ব্যক্ত করেছেন আজরা জেয়া। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের অংশীদারত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি তাদের উদারতা প্রশংসনীয় এবং আশা করছি, বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের জনগণের জন্য গণতন্ত্র আরো সমৃদ্ধ হবে।’
এদিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করেছে মার্কিন প্রতিনিধি দলটি। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন জানিয়েছেন, র্যাবের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহারে দেশটিকে পুনরায় অনুরোধ করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘আন্ডার সেক্রেটারি জেয়া, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লুসহ মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আমাদের খুব ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্বের বিষয় আমি পুনর্ব্যক্ত করেছি। দুদেশের মধ্যকার নিয়মিত আলোচনার বিষয়েও আমি সমর্থন প্রকাশ করেছি। মানবিক সহায়তা ও প্রত্যাবাসনসহ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের পরিদর্শনকালীন অভিজ্ঞতার বিষয়ে তারা আমাদের জানিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘শ্রম খাতে সংস্কার, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার এবং কর্মসূচি নিয়ে বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশের সব অর্জন সম্পর্কে তারা জেনেছে। বৈঠকে আমরা নাগরিক অধিকার এবং আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় করেছি। এছাড়া মানব পাচার ও নাগরিকের নিরাপত্তার বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। র্যাবের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহারে অনুরোধের পুনরাবৃত্তিও আমি করেছি।’
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় সব বিকল্প উপায় নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে স্বল্প পরিমাণে প্রত্যাবাসনে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ—এ বিষয়ে সর্বশেষ হালনাগাদ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। প্রতিনিধি দল তাদের ভাবনা আমাদের জানিয়েছেন।’
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে আজরা জেয়া বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সমর্থনে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের সব মন্ত্রীর কাছ থেকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। বৈশ্বিক মানবাধিকার নীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকে সমর্থন করে। এটি সফল করতে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে আমরা আমাদের ভূমিকা রাখতে চাই।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অংশীদারত্বের গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ আমি এ সফরে এসেছি। একটি উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে অংশীদারত্বকে আরো গভীর করার আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আমি মনে করি আমরা গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ আলোচনা করেছি। গতকাল (বুধবার) আমরা বাংলাদেশে সহিংসতামুক্ত বড় রাজনৈতিক সমাবেশ দেখেছি। এর পুনরাবৃত্তি আগামীতেও দেখতে চাই।’
নির্বাচনের আগে বড় দুই দলের মধ্যে সংলাপের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মার্কিন এ আন্ডার সেক্রেটারি বলেন, ‘নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ। আমরা সবাই সংলাপের পক্ষে। এখানে আমাদের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
বৈঠকে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন হোয়াইট হাউজের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাউথ এশিয়া রিজিওনাল অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর ব্রায়ান লুটি, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট টু দি আন্ডার সেক্রেটারি ব্রায়ান ওকলি।
এদিন বিকালে গুলশানের আমেরিকান ক্লাবে দেশের নাগরিক সমাজ, শ্রমিক সংগঠন ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করে মার্কিন প্রতিনিধি দলটি। বৈঠকে ডোনাল্ড লু এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস উপস্থিত ছিলেন। এতে অংশ নেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি কল্পনা আক্তার, আদিবাসী মানবাধিকার রক্ষাকর্মী রানী ইয়ান ইয়ান এবং বেসরকারি সংস্থা সলিডারিটি সেন্টার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর একেএম নাসিম।
সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে ছিল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক ও মানবাধিকার কর্মীদের অধিকার ও আইনি সুরক্ষা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, বাংলাদেশের অধিকার কর্মীদের কাজের পরিবেশ ও সমস্যাসহ মার্কিন ভিসা নীতির প্রভাব।
আজ সকাল নাগাদ ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে মার্কিন এ প্রতিনিধি দলের।

