যৌন স্বাস্থ্য প্রত্যেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ জুলাই ২০২৩
দেশ ডেস্ক:: লন্ডনের হোমারটন হেলথকেয়ার এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের যৌন স্বাস্থ্য এবং এইচআইভি ওষুধের পরামর্শদাতা ডা. তাসলিমা রশিদ ব্যাখ্যা করেন, আপনি যখন আপনার স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার কথা চিন্তা করেন, তখন আপনাকে আপনার সম্পর্ক এবং যৌন স্বাস্থ্যের কথাও ভাবতে হবে।
তিনি আরো বলেন, “আমাদের যৌন স্বাস্থ্যের দেখাশোনা আমাদের দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপন করতে এবং আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের যত্ন নিতে সাহায্য করে।”
কী ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়
“অনেক সংস্কৃতিতে যৌনতা নিয়ে কথা বলা কুসংস্কার হিসেবে বিবেচিত এবং এর ফলে অনেক মানুষ যখন তাদের পরামর্শ বা চিকিৎসার প্রয়োজন হয় তখন অস্বস্তিতে পড়ে।”
যে কেউই তাদের জীবনে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অসুবিধা অনুভব করতে পারে। যৌন স্বাস্থ্যের বিষয়টি আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে কেমন অনুভব করি সে সম্পর্কে, আমাদের সুরক্ষিত থাকার বিষয় সম্পর্কে, এবং তা উপভোগ করার সক্ষমতা, গর্ভনিরোধ ও সংক্রামক রোগগুলো প্রতিরোধ বিষয়ক এবং চিকিৎসার বিষয়গুলি নিয়ে আমাদের সচেতন করে।
কমিউনিটি ফার্মেসি, জিপি প্রাকটিস, যৌন স্বাস্থ্য ক্লিনিক (এসএইচসি) থেকে পরামর্শ ও যত্ন পাওয়া যায়, এটি জেনিটোরিনারি মেডিসিন (জিইউএম) ক্লিনিক নামেও পরিচিত। এগুলো চ্যারিটি অথবা স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠন নিয়ে চালিত । সেখানে কিশোর, তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক, এলজিবিটিকিউপ্লাস জনগণ এবং যারা যৌন সহিংসতা বা যৌনাঙ্গ কেটে ফেলার মতো ক্ষতিকর অভ্যাসের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, তাদের জন্য অনলাইন সহায়তা ও বিভিন্ন টেস্ট করার জন্য সেবা রয়েছে৷
এটা ক্যান্সার, ইনফেকশন নাকি অন্য কিছু?
ডা. রশিদ বলেন, “আমাদের শরীরের জন্য কোনটা স্বাভাবিক আর কিছু অন্যরকম হলে কোথায় সাহায্য পেতে হয়, এটি আমাদের জন্য জানা গুরুত্বপূর্ণ।’
মূত্রত্যাগ করার সময় জ্বালা-পোড়া, চুলকানি বা ব্যথা, অস্বাভাবিক স্রাব, ঘা বা এর বৃদ্ধি, রক্তপাত, বা যৌন সংগমের সময় ব্যথা বা ইরেকশনের ঘাটতি, এই সমস্ত লক্ষণ আপনার শারীরিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাকে নির্দেশ করে।
ডা. রশিদ বলেন, “এটি যৌনবাহিত সংক্রমণ অথবা অন্য কিছুও হতে পারে; মাঝে মাঝে এটি ক্যান্সার, এমনকি হূদরোগের মতো বিষয়ও হতে পারে। “তিনি আরও বলেন, “কিন্তু আপনি যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন, মেনোপজের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, অথবা বাড়িতে বা কাজের চাপ থাকলে, সেগুলো আপনার যৌন স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করতে পারে।”
স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের সঙ্গে কথা বললে আপনি যথাযথ পরীক্ষা, চিকিৎসা ও কাউন্সিলিং দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাবেন।
সার্ভিক্যাল ক্যান্সার
হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি) টিকা গ্রহণ এবং নিয়মিত সার্ভিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যেম সার্ভিক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। এসব ক্ষেত্রে ত্বকের সংস্পর্শের কারণে সংক্রমণ ছড়ায়। এইচপিভি খুবই সাধারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ক্যান্সার। এতে নারী-পুরুষ যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত সার্ভিক্যাল ক্যান্সার, মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সার এবং পায়ুপথ ও যোনি এলাকায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।
ভ্যাকসিন উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন এইচপিভি’র বেশ কয়েক ধরনের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়। এটি সন্তান জন্মদানের সক্ষমতাতেও প্রভাব ফেলে না। এই টিকা ১২-১৩ বছর বয়সী শিশুদের এবং টিকা নেননি এমন পঁচিশোর্ধ্ব নারী-পুরুষকে দেয়া হয়। (যেসব নারীর ১৯৯১ সালের ১ সেপ্টেম্বরের পর এবং পুরুষের ২০০৬ সালের ১ সেপ্টেম্বরের পর জন্ম তাদের দেয়া হয়।)
এইচপিভি বহু ধরনের সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের কারণ। এর সব ক’টি টিকা প্রতিরোধ করতে পারে না। এ কারণেই টিকা নেয়ার পরও নারীদের উচিত সার্ভিক্যাল পরীক্ষাগুলো করিয়ে রাখা। এতে করে এইচপিভি সংক্রান্ত নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকির বিরুদ্ধে লড়াই করা সহজ হবে। এগুলো স্মিয়ার টেস্ট নামে পরিচিত। এই পরীক্ষা সার্ভিক্যাল ক্যান্সার CERVICAL CANCER প্রতিরোধে সহায়ক হয়। ২৫-৬৪ বছর বয়সী নারীদের নিয়মিত এই পরীক্ষা করানো হয়।
সার্ভিক্স থেকে কোষের ছোট্ট একটি নমূনা সংগ্রহ করা হয়। উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন এইচপিভি পরীক্ষার জন্য এই নমূনা নেয়া হয়। প্রায় সব ধরনের সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের জন্যই এই এইচপিভি দায়ী। তবে এইচপিভি থাকার অর্থ এই নয় যে, আপনার সার্ভিক্যাল ক্যান্সার হবেই। তবে পাওয়া গেলে কোষের পরিবর্তন দেখার জন্যই পরীক্ষা করা হয়। কোষগুলোর যথা সময়ে চিকিৎসা না হলে তা ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।
ডা. রশিদ জানান, ‘আপনি যদি জীবনে একবার সেক্স করেন বা একজনের সঙ্গেই করেন, যদি বহু বছর সেক্স না করে থাকেন, যদি বহু পুরুষের সঙ্গে সেক্স নাও করে থাকেন বা দীর্ঘ সময় এর থেকে দূরেও থাকেন তবু আপনার এইচপিভি থাকতে পারে। ‘
যাদের সার্ভিক্স নেই তাদের পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন নেই। ট্রান্সজেন্ডারদের (নিজের লিঙ্গ পরিবর্তনকারি) মধ্যে যারা জিপি প্র্যাক্টিশনারের কাছে পুরুষ হিসেবে নথিভূক্ত হয়েছেন তাদের নিয়মিত পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় না। তবে কেউ যদি প্রয়োজন মনে করেন তারা পরীক্ষার জন্য অনুরোধ করতে পারেন।
যেসব পুরুষ অন্য পুরুষের সঙ্গে সেক্স করে অভ্যস্ত তাদের জন্য বিনামূল্যে এইচপিভি টিকা দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত এ সুবিধা নেয়া যেতে পারে। তারা যখন যৌন স্বাস্থ্যসেবার জন্য ক্লিনিকে যান বা এইচআইভি ক্লিনিকে যান তখন তারা এ সেবার জন্য আবেদন করতে পারেন। কিছু কিছু ক্লিনিক এইচপিভি পরীক্ষার সুযোগ দেয়।
নারীদের জেনিটাল মিউটিলেশনের পর সহায়তা
ব্রিটেনে এটা অবৈধ এবং শিশু নির্যাতন হিসেবে বিবেচিত। এ ক্ষেত্রে নারীদের যৌনাঙ্গের কিছুটা অংশ কেটে ফেলা হয় । চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর কোন ভিত্তি নেই। বিষয়টি সুন্নত, গুডনিন, হালালায়েস, তাহুর, মেগ্রেজ ও খিতান নামে পরিচিত।
এতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। এর গুরুতর শারীরিক-মানসিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে। পরবর্তীতে এর কারণে যৌন জীবনে, সন্তান ধারণে ও জন্মদানে সমস্যা দেখা দেয়। এ ব্যাপারে সাহায্য পাওয়ার জন্য একজন জিপি বা স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর সঙ্গে কথা বলুন। যেমন সন্তান-সম্ভাবা হলে মিডওইফের সহায়তা নিন।
ডা. রশিদ আরো বলেন, ‘আপনার সঙ্গে যদি এমন কিছু ঘটে থাকে তাহলে সহায়তা নিন। আমাদের পক্ষে আপনাকে সাবেক অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়, তবে আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারব। আপনাকে হয়তো এনএইচএস এফজিএম সাপোর্ট ক্লিনিকে পাঠাতে হবে। সেখানে আপনি কাউন্সিলিংসহ প্রযোজন হলে সার্জারির সেবাও পাবেন।
যৌনবাহিত সংক্রমণের পরীক্ষা
সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ইনফেকশন-এসটিআই SEXUALLY TRANSMITTED INFECTIONS যৌন সম্পর্কের সময় এই সংক্রমণ ঘটতে পারে। শরীরের ফ্লুইডের কারণে এই সংমণ ঘটে থাকে যেমন রক্ত, লালা, বীর্য । কন্ডোম বা ওই ধরনের কোন প্রতিরোধক ব্যবহারের মাধ্যমে এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও ত্বকের মাধ্যমেও এই সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
ডা. রশিদ জানান, এসটিআই পরীক্ষার কথা বললে অনেকেই চমকে যান । কারণ তাদের অনেকেরই সঙ্গী মাত্র একজন। তাছাড়া তাদের কোনো লক্ষনও নেই। তবে তাদের আশ্বস্ত হওয়া প্রয়োজন কারণ যৌন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হলে বিব্রত হওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ এটি আমাদেরই অংশ।
তিনি আরো বলেন, পরীক্ষার সময় সঙ্গে করে কাউকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে অস্বস্তির কিছু নেই। সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। অনুমতি ছাড়া রোগির কোনও তথ্য অন্য কাউকে দেয়া হয় না।
আপনাকে এইচআইভি পরীক্ষার জন্যও ডাকা হতে পারে। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত পরীক্ষার একটি অংশ এইচআইভি টেস্ট। এছাড়াও এ সময় হেপাটাইটিস বি ও সিফিলিস পরীক্ষাও করা হয়। আবার দেশের যে এলাকায় এইচআইভির হার বেশি সেখানে ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্ট এই পরীক্ষা করার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করে। এর পাশাপাশি হেপাটাইটিস বি ও সি-ও পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে দুই সহস্রাধিক মানুষের মধ্যে রক্তবাহিত রোগগুলো সনাক্ত হয়েছে।
ডা. রশিদ বলেন, ‘ মনে হতে পারে, আপনার এইচআইভি নেই। কিন্তু আমি পরামর্শ দেব, পরীক্ষা করান। আপরার যদি একাধিক যৌন সঙ্গী থাকে এবং কন্ডোম ব্যবহার না করেন বা পুরুষ হয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে থাকেন তাহলে আপনার উচিত তিনমাস পর পর পরীক্ষা করানো।”
তিনি আরো বলেন, ‘আপনার যদি সিম্পটম না থাকে তাহলে শুধু মানসিক শান্তির জন্য আপনি পরীক্ষা করাতে পারেন। এর জন্য আপনাকে কোনো ক্লিনিক বা অনলাইন বা ফার্মাসীতে যেতে হবে না। বাসায় থেকেই এই পরীক্ষা করা সম্ভব। এগুলো বিনামূল্যে ডাকযোগে পাঠানো হয়।’
এইচআইভি সনাক্তের পরও ভালো থাকা সম্ভব
ইউকেতে বর্তমানে ৯৫ হাজারের বেশি মানুষ এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছেন। আরো চার হাজারেরও বেশি মানুষ আছেন যারা না জেনেই এই রোগ শরীরে নিয়ে ঘুরছেন।
বিট্রিস ওসোরো দাতব্য সংস্থা পজিটিভলি ইউকেতে POSITIVELYUK কাজ করেন । তিনি ব্লাড বর্ন ভাইরাস (বিবিভি) পজিটিভদের নিয়ে কাজ করেন । ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে এই পরীক্ষা করা হয়।
তিনি বলেন, ‘সমকামী নন এমন নারী, বয়স্ক মানুষ এবং কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান জাতিগোষ্ঠীর মানুষ অনেক দেরিতে পরীক্ষা করেন। তাদের সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এ সত্য কী করে প্রিয়জনদের জানাবেন। ভয় পান, প্রিয়জনরা হয়তো তাদের প্রত্যাখ্যান করবেন বা তাদের লজ্জায় পড়তে হবে।’
এর কোনো প্রতিষেধক নেই । তবে আধুনিক ওষুধের কল্যাণে শরীরে ভাইরাসের মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে রাখা যায় । ওষুধ ব্যবহার করে মানুষ সুস্থ থাকে, ভাইরাস ছড়াতে পারে না। সেক্স করা, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মদান বা স্তন্যদানের সময়ও তা অন্যকে আক্রান্ত করতে পারে না।
তিনি (বিট্রিস ওসোরো) বলেন, ‘আমি চাই, মানুষ জানুক, এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটা নিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব । ওষুধ খেলে এটা অন্যদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে না। এইচআইভি থাকার অর্থ মৃত্যুদণ্ড নয় । আমি জানি, কারণ গত ২৮ বছর ধরে এই ভাইরাসটি শরীরে বহন করে চলেছি আমি । তবে আমাকে জীবনযাপনে বহু পরিবর্তন নিয়ে আসতে হয়েছে । কাজটি সহজ ছিল না। কিন্তু আমি জানতাম, সুস্থ থাকতে হলে কাজগুলো আমাকে করতে হবে। আমাকে আমার শরীরের যত্ন নিতে হবে, পরিবারের যত্ন নিতে হবে এবং আমার জীবনের বাকিটা এই ভাইরাস নিয়েই কাটাতে হবে।
এ ব্যাপারে আরো তথ্য জানতে ভিজিট করুন NHS.UK ফোন করুন এনএইচএস 111 বা ন্যাশনাল সেক্সুয়াল হেলথ সার্ভিস এডভাইস লাইন 0300 123 7123 নাম্বারে।

