আমরাই সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছি: এক বছর পূর্তিতে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মেয়র লুৎফুর রহমান
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ জুন ২০২৩
টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বাসিন্দাদের জন্য গত ১২ মাসে কী কী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত নির্বাহী মেয়র তাঁর মেয়াদের চার বছরের জন্য যে ১২৩ টি প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে প্রথম বছরেই প্রায় ৪০টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন অথবা গৃহীত প্রজেক্টগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ দিয়ে এক অনন্য রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন।
নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বে কাউন্সিলের নতুন প্রশাসনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ১ জুন বৃহ¯পতিবার বিকেলে হোয়াইটচ্যাপেল-এ কাউন্সিলের নবনির্মিত টাউন হলে এক মিডিয়া ব্রিফিং এর আয়োজন করা হয়।
২০২২ সালের ৫ মে তিনি এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন আসপায়ার পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কাউন্সিলের ক্ষমতায় আসে এবং তিন মাসের মাথায় অর্থাৎ গত বছরের আগস্ট মাসে কাউন্সিলের স্ট্রাটিজিক প্লানে মেয়র লুৎফুর রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখিত এজেন্ডাগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়।
বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত মিডিয়া ব্রিফিং এ ডেপুটি মেয়র কাউন্সিলার মাইয়ুম মিয়া তালুকদার, হেড অব মেয়র অফিস এমি জ্যাকসন, ডেপুটি হেড আলিবর চৌধুরীসহ কাউন্সিলের উর্ধতন কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ব্রিফিং শেষে সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের গোটা টাউন হল ঘুরিয়ে দেখানো হয়। ঐতিহাসিক রয়েল লন্ডন হসপিটালের গ্রেড-টু বিল্ডিং কে ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে নতুন টাউন হল হিসেবে রূপান্তরে ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিকায়নের অপূর্ব মিশেল দেখে অতিথিরা প্রশংসা করেন। উল্লেখ্য নিজস্ব টাউন হল স্থাপন করায় বছরে ১৬ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় হবে।
মিডিয়া ব্রিফিংকালে নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেছেন, বারার বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নত করার জন্য আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা ৮ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলাম। স্থানীয় জনসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সবগুলো বিষয় এই ৮ টি পয়েন্টে অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এই ৮ দফা হলো-(১) ট্যাকলিং কস্ট অব লিভিং ক্রাইসিস (জীবনযাত্রা ব্যয় বৃদ্ধির সংকট মোকাবেলা; (২) হোমস ফর ফিউচার (ভবিষ্যতের জন্য ঘর–বাড়ি; (৩) এক্সিলারেট এডুকেশন (সেরা মানের শিক্ষা; (৪) বোস্ট কালচার, বিজনেস, জব এন্ড লেজার (সংস্কৃতি, ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও অবকাশ সুবিধার উন্নতি; (৫) ইনভেস্ট ইন পাবলিক সার্ভিস (গণ সেবাখাতে বিনিয়োগ); (৬) এমপাওয়ার কমিউনিটি টু ফাইট ক্রাইম (অপরাধ মোকাবিলায় কমিউনিটিকে ক্ষমতায়ন করা; (৭) ক্লিন এন্ড গ্রীন ফিউচার (দূষণমুক্ত ও সবুজ ভবিষ্যত) এবং (৮) এ কাউন্সিল দ্যাট লিসেন টু ইউ (আপনার কথা শুনে-এমন কাউন্সিল)।

মিডিয়া ব্রিফিং-এ জানানো হয়, ইতিমধ্যে মেয়র লুৎফুর রহমানের কিছু কর্মসূচি বা উদ্যোগ ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রথম হওয়ায় বিবিসি সহ মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রাইমারি স্কুলের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো সেকেন্ডারি স্কুল পর্যায়ে ইউনিভার্সেল ফ্রি মিলস (সকল শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ) সুবিধা চালু, ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস ও এডুকেশন মেইনটেন্যান্স এলাউন্স এবং ফ্রি হোম কেয়ার সার্ভিসেস প্রবর্তন করেছেন। এছাড়া, ইয়ুথ সার্ভিসের ক্ষেত্রে বাজেট কর্তনের মত জাতীয় র্ট্যান্ড বা ধারার বিপরীতে গিয়ে বারায় ইয়ুথ সার্ভিসকে পুনর্জীবিত করার জন্য অর্থাৎ গোটা বারা জুড়ে নতুন নতুন (২০ টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে) ইয়ুথ সেন্টার বা ইয়ুথ প্রজেক্ট চালুর জন্য বছরে প্রায় ১৪ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে নির্বাহী মেয়র দাবি করে বলেন, এমন বরাদ্দ গোটা দেশের আর কোনো কাউন্সিল করবে না। এছাড়া বারার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো উন্নত ও সুসংহত করতে নতুন করে ৪১ জন এনফোর্সমেন্ট অফিসার নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটস এনফোর্সমেন্ট টিমকে প্রায় ৭০ জনে নিয়ে যাওয়া এবং পর্যায়ক্রমে অন্তত ৩৩ জন অতিরিক্ত পুলিশ নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর যথেষ্ট সক্রিয়তার সাথে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে চার বছরে ৪ হাজার সোস্যাল রেন্টেড ঘর নির্মাণের কর্মসূচি। ইতিমধ্যে সোস্যাল বা প্রাইভেট ল্যান্ডলর্ড ছাড়াও নতুন ঘর নির্মাণের জন্য কাউন্সিল বারার মধ্যে বেশ কিছু জায়গা নির্ধারন করতে সক্ষম হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের জন্য ট্যাক্স ফ্রিজ রাখা লন্ডনের মাত্র তিনটি কাউন্সিলের অন্যতম একটি হচ্ছে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল। এর ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এই কঠিন সময়ে টাওয়ার হ্যামলেটস সহ অন্য দুটি কাউন্সিলে থাকবে অপরাপর বারার তুলনায় কম কাউন্সিল ট্যাক্স।
ব্রিফিংকালে নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, দেশের যে কোন লোকাল অথরিটির তুলনায় সবচেয়ে উচ্চাকাংখার এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছি আমরা। নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আমাদের শুরুটা ভালো হয়েছে, তবে অবশ্যই আরো অনেক কিছু করার রয়েছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সার্ভিস উন্নত ও কার্যকর করাই আমাদের অন্যতম আগ্রাধিকার। এছাড়াও আমরা বারার ভবিষ্যত বিনির্মানে ভূমিকা রাখছি যেমন টাওয়ার হ্যামলেটস হোমসকে পুরোপুরি কাউন্সিল নিয়ন্ত্রনে আনা। একই সাথে আমরা লেজার সার্ভিস ও ইয়ুথ সার্ভিসকেও কাউন্সিলের অধীনে নিয়ে আসছি। অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ এই সার্ভিসগুলো সরাসরি কাউন্সিলের অধীনে আনার ফলে আরো ভালো ও উন্নত সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি এবং এতে করে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য আরো বেশি চাকুরীর সুবিধা তৈরি হবে।
মেয়র লুৎফুর বলেন, সাধারণ মানুষের সাথে উঠা–বসা–কথা বলায় আমার বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু কাউন্সিলের অফিসিয়াল দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পাশে ব্যক্তিগতভাবে বা ইভেন্টের মাধ্যমে সব সময় ছুটে যাওয়া সহজ হয়ে উঠে না, যা আমার জন্য কষ্টকর। তবে, প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও সোমবার নিয়মিত ২টি সার্জারি করার মাধ্যমে মাসে প্রায় ৫ শ’ মানুষের সাথে সরাসরি দেখা করার, কথা বলার এবং তাদের বক্তব্য শোনার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
বারার এডুকেশন ও ইয়ুথ সার্ভিসে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়ার কথা উল্লেখ করে মেয়র লুৎফুর বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চরম এই দুঃসময়ে বারার বাসিন্দাদের পাশে দাড়াতে আমরা কস্ট অব লিভিং প্রজেক্ট গুলোতে বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছি। আমরা জানি এই কঠিন দিনে, অর্থনীতির চলমান বিপদের এই সময়ে আমরা যতটুকু সম্ভব স্বল্প আয়ের মানুষের পাশে থাকতে চাই। তাই যারা ফ্রি স্কুল মিল পায় তারা যেন স্কুল হলিডে চলাকালীন সময়েও প্রোটিনযুক্ত খাবার পায়-সেটা নিশ্চিত করতে আমরা শিশু প্রতি হলিডে গ্রান্ট হিসেবে ১ শ’ পাউন্ড বরাদ্দ রেখেছি। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্যও রয়েছে বিশেষ বরাদ্দ। আর প্রায় ৭ হাজার পেনশনারকেও আমরা ১ শ’ পাউন্ড করে আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় সহযোগিতার অংশ হিসেবে আমরা কাউন্সিল ট্যাক্স ফ্রিজ রেখেছি, সাথে সাথে এ ক্ষেত্রেও ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের জন্য রয়েছে বাড়তি সহযোগিতা। সবমিলিয়ে এই ক্ষেত্রে আমাদের বাজেট ৬,১ মিলিয়ন পাউন্ড। এছাড়া ১৫ হাজার পরিবারের জন্য আমরা শিগগিরই আরেকটি ফ্যামেলি গ্রান্ট রিলিজ করবো।
তিনি বলেন, আমি এবং আমাদের কেবিনেট মেম্বার ফর হাউজিং কাউন্সিলার কবির আহমেদ সহ পুরো টিম কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছি। চার বছরে ৪ হাজার সোস্যাল হাউজ সরবরাহের যে প্রতিশ্রæতি আমরা দিয়েছি, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা দিন–রাত সময় দিচ্ছি। শুধুমাত্র হাউজিং নিয়ে গত তিন সপ্তাহে আমরা ৩টি প্রায় দিনব্যাপী এওয়ে মিটিং (এক নাগাড়ে ৫/৬ ঘণ্টা)করেছি। আমাদের সকল কর্মপরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে আমরা সবার কাছে দোয়া ও সহযোগিতা চাই।
মেয়র লুৎফুর বলেন, আমি যখন প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র ছিলাম, তখন মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ‘ডিলার এ ডে’ নামে একটি অভিযান গ্রহণ করেছিলাম যার লক্ষ্যনীয় প্রভাব বাসিন্দারা বাস্তবে দেখতে পেরেছিলেন। বিশেষ ঐ অভিযানে শুধুমাত্র পথেঘাটে ছোটখাটো ড্রাগ ক্রেতা বা বিক্রেতাকে টার্গেট না করে বড় বড় ডিলারদের পাকড়াও করা হতো। আবারো আমরা সেরকম সক্রিয়তা চাই।

