কমিউনিটি সংগঠনগুলো কি পারস্পারিক সম্প্রীতি নষ্ট করছে?
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ মার্চ ২০২৩
ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটি সংগঠনগুলোর যাত্রা কবে কখন শুরু হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে ব্যক্তিগত অনুসন্ধান থেকে যতটুকু জানতে পারি- প্রথমে শুরু হয়েছিলো অভিবাসী বাংলাদেশীদের দ্বারাই । তবে এর পেছনে কারণও রয়েছে। কারণ তখন অভিবাসী মানুষের সংখ্যা ছিলো নিতান্ত কম । তবে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিলো চমৎকার। আর এই কারণে হয়তো কে কোন জেলা থেকে এসেছেন একথা বিবেচনা করা হতোনা । বিবেচনা করা হতো বাঙালি হিসাবে । আর সময়ের আবর্তে এখন আর বাংলাদেশের নাম দিয়ে সংগঠনের সংখ্যা নিতান্ত নগন্য । এখন দেশ থেকে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রামের নামে গড়ে উঠেছে হাজারো সংগঠন । সবার উদ্দেশ্য সামাজিক সেবামূলক কাজ করা। তবে মজার ব্যাপার হলো – প্রত্যেকটি সংগঠনের বিপরীতে একাধিক, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২-৩ টি বিদ্রোহী সংগঠনও রয়েছে।
আমি কখনোই কমিউনিটি সংগঠনের বিরুদ্ধে নই । ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সামাজিক সংগঠনের প্রয়োজন এবং সামাজিক কর্মকান্ডে প্রতিযোগিতা থাকা ভালো। তবে প্রতিহিংসা থাকা অত্যন্ত খারাপ । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে সংগঠনগুলো যাত্রা শুরু করে এবং কিছুদিনের মধ্যে দেখা যায় সংগঠনটি হোঁচট খায়। এই হোঁচট খাওয়ায় পেছনে রয়েছে অনেক কারণ । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় নেতৃত্বের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এই আর অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে প্রতিহিংসা । অর্থাৎ কেউ কারো নেতৃত্ব মানতে চায়না আর সবাই নেতা হতে চায় । সে যোগ্য কিনা সে ব্যাপারটির ধার ধারেনা। তবে এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটু অতি উৎসাহী ভাব লক্ষ্য করা যায় । অনেকেই বুঝে না বুঝে অযোগ্য মানুষদেরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উস্কানি দিতে দেখা যায় । আর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে অনেকে অনেকের সাথে কথা বলা এমনকি মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ করে দেন । পরস্পরে প্রতি বিষোদ্গার এমন পর্যায়ে পৌঁছে যা শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায় । আর অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সামাজিক কর্মকান্ডের জন্য গচ্ছিত হাজার হাজার পাউণ্ড আদালতে খরচ হয় । এমনও হয় যে, মামলার খরচ হয়ে দাঁড়ায় সংগঠনের মুল তহবিলের চেয়ে বেশি । সামাজিক সংগঠনের নামে এই সকল কর্মকান্ড নিতান্তই মশকারা ছাড়া আর কিছু না। আর প্রায়ই দেখা যায় এই বিষয়গুলো সমাধানের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনা বরং সম্ভব হলে আরো বাড়িয়ে দেয়।
আবার এমন অনেক সংগঠন রয়েছে, সামাজিক উন্নয়ন কাজে দুই বছরে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে তার চেয়ে বেশি সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনের পেছনে খরচ করেছে । আর শুধু কমিউনিটি সংগঠন বললে ভুল হবে, মসজিদ কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও কিন্ত এর সাথে পাল্লা দিয়ে রয়েছে । প্রায়ই বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হতে দেখা যায় । আর এর মুলে রয়েছে নেতৃত্বের কোন্দল । অর্থাৎ কেউ কারো নেতৃত্ব মানতে চায় না ।
বেশিরভাগ সামাজিক সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে নিজ নিজ এলাকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করা । অর্থাৎ সংগঠনের সদস্য ও প্রবাসী শুভাকাংখীদের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা, বাসস্থান, গৃহনির্মাণ, চিকিৎসা সেবায় কাজ করা । অবশ্য কিছু কিছু সংগঠন মাঝে মাঝে বৃটিশ-বাঙালি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে থাকে । এ ধরনের সংগঠনের সংখ্যা খুবই কম । এই কর্মটি করে তারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলেন আমরা ইউকের ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জন্য অনেক করেছি ।
ব্রিটেনে বাঙালি অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ। আর এই ৮ লক্ষ মানুষের রয়েছে হাজারো সমস্যা । ২০২০ সালের বিবিসির এক জরিপ অনুযায়ী ব্রিটেনে প্রতি তিনটি বাংলাদেশী পরিবারের মধ্যে একটি বাসস্থান সংক্রান্ত সমস্যায় জর্জরিত । তারা প্রতিনিয়ত এডভাইস সেন্টার, সলিসিটর অফিস আর কাউন্সিল অফিসে দৌড়াদৌড়ি করেন। সুতরাং, কমিউনিটি সংগঠনগুলো যদি এডভাইস সেন্টার খুলে সেবা কিংবা পরামর্শ দিতো তাহলে মানুষ উপকৃত হতো।
ড্রাগ বা মাদক আমাদের কমিউনিটির একটি ভয়াবহ সমস্যা । তাছাড়া রয়েছে নাইফ ক্রাইম। অনেক ক্ষেত্ৰে দেখা যায়, ভালো প্যারেন্টিংয়ের অভাবে বাচ্চারা বিপদগামী হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবা-মা নিজেও জানেননা ভালো প্যারেন্টিং কী এবং কীভাবে করতে হয়।
সঠিক উপদেশ কিংবা পরামর্শ যদি এই সকল সংগঠনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষদের দেয়া হতো মানুষ অনেক ক্ষেত্রে উপকৃত হতো। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কে পরিবারের কর্তা ব্যক্তিদের ভালো জ্ঞান না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাচ্চারা বিপদগামী হয় । কারণ তারা নিজেরাও জানেননা বাচ্চাদের কিভাবে পরামর্শই দিবেন । এক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ সামাজিক সংগঠনগুলো করতে পারে। বছরজুড়ে সামাজিক সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পার্টি থাকে, আর এইসব পার্টিতে কাজগুলো না করে বরং শুধু ছবি তুলে আর ফেসবুকে আপলোডের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকেন।
বিলেতে এখনো অনেক মানুষ রয়েছে যারা ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কেউ যদি আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন তাহলে সবিনয়ে বলবো তর্ক করার আগে ব্রিটেনের বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের ফুড ব্যংকের লাইনগুলো একটু ভালো করে দেখবেন। তাছাড়া মার্চের প্রথম সপ্তাহে শাডওয়েলে একটি ২ বেডরুমের বাসায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তদন্তে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য। জানা যায়, ওই ২ বেড রুমের ঘরে ১৮ জন বাংলাদেশী বসবাস করতেন । সামাজিক সংগঠনগুলোর কাউকে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শুনিনি।
এই সমস্যাগুলো দেখার কিংবা শুনার কেউ নাই। খুব কম বাঙালি সংগঠন রয়েছে যারা এসকল সমস্যা নিয়ে কাজ করে। যদি সংখ্যায় ধরা যায় তাদের সংখ্যা নিতান্ত নগন্য। তাদের ধারণা এই সব সমস্যা সমাধানের দ্বায়িত্ব ব্রিটিশ সরকারের অথবা একান্তই তাদের ব্যক্তিগত। সামাজিক সংগঠনগুলোর কোনও দায় নাই কিংবা চিন্তা করার কোনো সময়ও নাই। তবে ব্রিটিশ মূল ধারার অনেক চ্যারিটি সংস্থা রয়েছে যারা প্রতিনিয়ত এই কাজগুলো করে যাচ্ছে । তাদের মধ্যে কোন্দল খুব কম দেখা যায়। আর মানুষের উপকারের কথা বিবেচনা করলে, সাধারণ মানুষ সেই সকল সংগঠন থেকে প্রতিনিয়ত উপকৃত হচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে বাংলাদেশের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রদানের ক্ষেত্রে শুধুমাত্ৰ বৈধ বাংলাদেশী পাসপোর্ট গ্রহণের একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। যদিও স্বাধীনতা উত্তর ব্রিটিনে দীর্ঘ ৫০ বছর বাঙালিরা ব্রিটিশ পাসপোর্ট দিয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করে আসছিলেন। এই নতুন নীতিমালার কারণে কমবেশি সবাই ভুক্তভোগী । আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, ২/১ টি ছাড়া কোনো সংগঠনই এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে টু শব্দ করেনি। যদি সবাই মিলে আমরা কথা বলতাম তাহলে কাজ হতো । তা না করে আমরা নীরব। কোনও কথা বলিনা । যারা এখন মনে করছেন আমার কোনো সমস্যা নাই, সময়ের ব্যবধানে বুঝতে পারবেন এই সমস্যার মধ্যে একদিন আমরা সকলকেই পড়তে পারি।
কমিউনিটি সংগঠনগুলোর নির্লিপ্ততার কারণে দিন দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরী হচ্ছে । কারণ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বড় হয়ে যুক্তরাজ্যে আসা মানুষরা এই সকল সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। এদের সংখ্যা ৯৯ পার্সেন্ট অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি। আর এর প্রধান কারণ হলো আমাদের মধ্যকার কোন্দল। কমিউনিটি সংগঠনগুলোর এই কোন্দল ও প্রতিহিংসার কারণে নতুন প্রজন্ম তাতে আগ্রহ দেখায় না। তারা সময়, অর্থ আর সম্পর্ক নষ্টের কথা বলে এড়িয়ে চলে।
আমার এই লেখার মূল উদ্দেশ্য সামাজিক সংগঠনের বিরুদ্ধে বিষোদগার নয় বরং সংগঠনের নেতৃবৃন্দের প্রতি আহবান জানানো, আপনাদের মানসিকতা, কাজের পরিধি এবং পরিসীমা বদলে ফেলুন । বিলেতের নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার জন্য বিলেতমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করুন। অন্যথায় দিনের পর দিন এই সংগঠনগুলো আমাদের মধ্যে সম্প্রীতি আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরী করবেনা বরং বিনষ্ট করবে।
লেখক: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী : প্রিন্সিপাল সলিসিটর, কেসি সলিসিটর্স, ইউকে।

