শ্যাডওয়েলে ফ্লাটে অগ্নিকাণ্ডের ১৮ জন দগ্ধ: একজনের মৃত্যু
প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ মার্চ ২০২৩
দেশ রিপোর্ট:: যুক্তরাজ্যের ইস্ট লন্ডনের শ্যাডওয়েল এলাকার একটি ফ্লাটে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৮ জন দগ্ধ হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বেশিরভাগই বাংলাদেশী শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। গত ০৪ মার্চ শনিবার এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাসায় থাকা একটি বাইসাইকেলের ব্যাটারি থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে।
এ ঘটনায় দগ্ধ মো. মিজানুর রহমান (৪১) নামে এক বাংলাদেশী যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গত ০৯ মার্চ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে লন্ডনের রয়্যাল হসপিটালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। নিহত মিজানুর নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুর রবের ছেলে। মিজানুর মাত্র ১৮ দিন আগে জীবিকার তাগিদে লন্ডন এসেছিলেন।
এই ঘটনায় তোলপাড় চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই ফ্ল্যাটের দুটি রুমে গাদাগাদি করে ১৮ থেকে ২০ জনের অধিক মানুষ করতেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে স্থানীয় লোকজন কয়েকবার টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয়দের কথা আমলে নেয়নি টাওয়ার হ্যামলেটস হোমস।
জানা গেছে, ইস্ট লন্ডনের শ্যাডওয়েলের মাডডকস হাউজের ওই ফ্লাটে গত ০৪ মার্চ শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাইসাইকেলের ব্যাটারি থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত সূত্রপাত হয়। ঘটনার সময় ওই ফ্ল্যাটের দুটি রুমে ১৮ জন ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন লাগার বিষয়টি টের পেয়ে তাদের সবার ঘুম ভাঙে। এসময় তারা দ্রুত সিড়ি দিয়ে ভবনের নিচে নেমে আসেন। কিন্তু রুমে আটকা পড়েন মিজানুর রহমান। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৯ মার্চ বৃহস্পতিবার মিজানুর রহমানের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় ১২ মার্চ রোববার দুপুরে পুর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে ওই ফ্লাটে মানবেতর জীবনযাপনের করুণ বর্ণনা দেন। দুই শিক্ষার্থী জানান, ঘটনার রাতে ওই বাসার দুটি বেড রুমে তারা ১৮ জন ছিলেন। দুটি রুমে তারা ১৮ থেকে ২০ জন থাকতেন। মাঝেমধ্যে ২১ জনও ছিলেন। একজন থাকতেন কিচেনে । প্রতিদিন রাত ৮টার দিকে ফ্লাটের মালিক তার স্ত্রীসহ আসতেন। তিনি বাসিন্দাদের জন্য রান্না করতেন, আর তার স্ত্রী ক্যাশ ভাড়া আদায় করতেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে সপ্তাহে ৯০ থেকে ১০০ পাউন্ড পর্যন্ত আদায় করা হতো। সেই হিসেবে বাড়িওয়ালা মাসে কমপক্ষে সাড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ভাড়া তুলতেন ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ফ্লাটের একটি সিঙ্গেল রুমের ছবি প্রচার হয়েছে। এতে দেখা যায় একটি রুমে ৮টি বেড উপরনিচ করে রাখা। দুই রুমে কমপক্ষে ২২টি বেড রাখা ছিলো বলে ধারনা করা হচ্ছে। আর এই ২১জন বাসিন্দার জন্য ছিলো একটিমাত্র বাথরুম।
ভুক্তভোগীরা অরো জানান, ঘটনার রাতে বাসায় রাখা বাইসাইকেলের ব্যাটারি থেকে আগুন লাগে। তখন প্রাণ বাঁচাতে তারা দ্রুত নিচে নেমে যান। এসময় কেউ সাথে কোনো কিছু নিয়ে যেতে পারেননি। পরে দারুল উম্মাহ মসজিদে তাদেরকে কয়েক ঘণ্টা থাকতে দেওয়া হয়। মসজিদ কর্তৃপক্ষ তাদেরকে প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয় সরবরাহ করেন। এরপর টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল তাদের থাকার ব্যবস্থা করে।
এদিকে নিহত মিজানুর রহমানের বাবা ইউপি সদস্য আবদুর রব জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। ২০১৯ সালের প্রথম দিকে দেশে ফিরে আসেন। এর পর থেকে দেশেই ছিলেন। ধার- দেনা করে প্রায় ১৬ লাখ টাকা খরচ করে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যে আসেন মিজান। তিনি বলেন, তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে মিজান দ্বিতীয়। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তিনি মিজানুরের লাশ দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
যা বললেন নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান: এ বিষয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। মিজানুর রহমান নামে যিনি মারা গেছেন, আল্লাহ তাকে বেহেশত নসীব করুন এবং তার পরিবারকে ধৈর্য্য ধারণের তৌফিক দিন। মেয়র বলেন, আমি কখনও ভাবতেও পারিনি যে এত মানুষ একটি বাসার মধ্যে থাকতে পারেন। দুটি রুমে ১৬-১৭ জন মানুষ থাকতেন। এটা সত্যি অপ্রত্যাশিত। তিনি বলেন, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেজন্য কাউন্সিল সতর্ক থাকবে। তিনি বাড়িওয়ালাদের সতর্ক করে বলেন, আপনারা কাউকে ঘর ভাড়া দিলে আইন মেনে দেবেন। অবৈধভাবে কাউকে ঘর ভাড়া দেবেন না। যদি কারো জানা থাকে যে কোনো বাসায় অবৈধভাবে কেউ থাকে তাহলে আমাদের জানাবেন। আমরা ব্যবস্থা নেব।

