শীতে আপনার স্বাস্থের যত্ন নিন
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ জানুয়ারি ২০২৩
দেশ ডেস্ক, ২০ জানুয়ারি ২০২২: যুক্তরাজ্যে এখন শীতকাল চলছে। এখন আমরা যখন বাইরে বের হই তখন অতিরিক্ত পোশাক পরিধান করি । অন্যদিকে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আমরা যখন ঘরে থাকি তখনও আমরা আমাদের এনার্জি বিল বাঁচানোর উপায় নিয়ে চিন্তা করি । এই সময়টি কাশি, সর্দি এবং গলা ব্যথা হওয়ার সময়- তাহলে এসব থেকে বাঁচতে আমরা কী করতে পারি?
চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ বেশী দরকার
আমরা জানি কোভিড-১৯ এখনও আমাদের সাথে রয়েছে, এই শীতে ফ্লু পুরোদমে ফিরে এসেছে এবং রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাসও (আরএসভি) ছড়িয়ে পড়ছে। এই ভাইরাসগুলির যে কোনও একটি থাকা বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষত নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত সমস্যায় থাকা মানুষের জন্য অরো বেশি সমস্যার কারণ হতে পারে । যদি আমরা একই সময়ে এসব অসুস্থতায় পড়ি, তবে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার বা হাসপাতালে যাওয়ার আশংকা আরও বেড়ে যাবে।
লন্ডনের একজন জিপি ডঃ তেহসিন খান বিষয়টি খুব সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছেন । তিনি বলেন, টিকাগুলি ভাইরাসের বিরুদ্ধে সর্বোত্তম সুরক্ষা দেয়:
“কোভিড-১৯ টিকাগুলি অগণিত মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে । ভ্যাকসিন ব্যবহারের কারণে হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালে যাওয়া থেকে বেঁচেছেন। এসব টিকা ভাইরাস থেকে আমাদেরকে নিরাপদ রেখেছে । যদি আপনি বা আপনার প্রিয়জন এখনও টিকাগুলোর প্রয়োজনীয় সমস্ত ডোজ না নিয়ে থাকেন তাহলে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে খুব বেশি দেরি হয়নি। আজই টিকা নিন ।”
সিজনাল কোভিড-১৯ এবং ফ্লুর টিকাগুলো ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রত্যেকের জন্য পাওয়া যাচ্ছে । বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা, কেয়ার হোমের বাসিন্দা, নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত সমস্যায় থাকা লোকজন এবং ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যসেবী ও কেয়ার কর্মীদের জন্য । তিনি আরো বলেন, ফ্লুর টিকাগুলো প্রাইমারি স্কুলের দুই ও তিন বছরের শিশু এবং সেকেন্ডারি স্কুলের ৭, ৮ এবং ৯ বছর বয়সী শিশুদেরও দেওয়া হচ্ছে ।
ডাঃ তেহসিন আরো বলেন “যদি টিকা নেয়ার জন্য আপনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তাহলে আপনাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটি নিতে অনুরোধ করছি । রোগীরা প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞাসা করে, কেন তাদের আরও টিকা নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যদি তারা ইতিমধ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে ওঠেছেন, তাহলে তাদের তো ফ্লু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, টিকা নেয়ার কারণ হল, বিভিন্ন ধরনের নতুন ভাইরাস থেকে আমাদের রক্ষা পাওয়া। তাছাড়া সময়ের সাথে সাথে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তাই আমরা যারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছি তাদের এটিকে টপ আপ করার জন্য আমন্ত্রণ জানাই। প্রতি বছর ফ্লু ভ্যাকসিনের প্রয়োজন হয় কারণ ফ্লু সৃষ্টিকারী ভাইরাস প্রতি শীতে পরিবর্তন হয়।
“টিকায় শুকরের মাংস অথবা গরুর মাংসের জেলেটিন আছে কিনা সে বিষয়েও আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় । কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনে কোনও প্রাণীজ পণ্য নেই, ফ্লুর টিকায় কোনো জেলেটিন থাকে না এবং ডিম-মুক্ত টিকাও পাওয়া যায়। শিশুদের নাকের স্প্রেতে শুকুরের মাংস থেকে প্রাপ্ত জেলেটিন থাকে, তাই যদি এটি আপনার সন্তানের জন্য ব্যবহারে সমস্যা হয়, তাহলে অনুগ্রহ করে নির্দেশনার জন্য আপনার ধর্মীয় নেতার (মসজিদের ইমাম) সাথে কথা বলুন, অথবা নাকের স্প্রের পরিবর্তে জেলেটিনহীন ভ্যাকসিন জ্যাব নেওয়ার ঝুঁকি এবং সুবিধা সম্পর্কে আপনার জিপির সাথে আলোচনা করুন।
সবধরনের এনএইচএস টিকা নিরাপদ এবং কার্যকর এবং বিভিন্ন কমিউনিটির হাজার হাজার মানুষের ওপর ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে । আপনি নিচের কিউআর কোড স্ক্যান করে আপনার কোভিড-১৯ টিকা বুক করতে পারেন। আপনি www.nhs.uk/
অসুস্থ হলে কী করবেন?
আপনি যখন অসুস্থবোধ করবেন তখন কীভাবে নিজের যত্ন নিবেন- এ ব্যাপারে নিচে কয়েকটি টিপস দেয়া হলো:
• আপনার শরীরকে পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন এবং ঘুমান।
• হাইড্রেটেড থাকার জন্য প্রচুর পরিমাণ পানি এবং উষ্ণ পানীয় পান করুন।
• কম্বল জড়িয়ে ও গরম পানির বোতল দিয়ে উষ্ণ থাকুন এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত পোশাক দিয়ে শরীর মুড়ে রাখুন৷
• প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন যেকোনো ব্যথায় সাহায্য করতে পারে এবং আপনার তাপমাত্রা কমাতে পারে।
ডাঃ তেহসিন খান পরামর্শ দেন, “হাত ধোয়া, মুখ ঢেকে রাখা, শারিরীক দুরত্ব বজায় রাখা, একাকী থাকা এবং ঘরে বায়ুচলাচল সহজ রাখার কথা মনে রাখতে হবে । তার মানে জীবানুনাশক হ্যান্ড জেল ব্যবহার করা এবং নিয়মিত হাত ধোয়া । অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমাতে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন, অথবা যদি আপনাকে বাইরে যেতেই হয় তবে মাস্ক পরুন। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন । বিশেষ করে শারীরিক স্বাস্থ্য জটিলতা আছে এমন লোকদের কাছ থেকে দুরে থাকবেন । কারণ তারা আরও দুর্বল এবং বেশি জটিলতার ঝুঁকিতে রয়েছেন । আপনি যখন সুস্থবোধ করবেন এবং বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে তাদের ঘরে যাবেন, সেখানে ঘরের জানালাগুলো খুলে রাখতে বলবেন । যাতে ভাইরাসগুলি ছড়িয়ে না পড়ে এবং অন্যদের সংক্রমিত করে ।
বয়স্ক প্রতিবেশী, পরিবারের সদস্য এবং বন্ধু-বান্ধবদের তাদের প্রেসক্রিপশনের ওষুধ সংগ্রহ করতে, খাবার কেনাকাটা করার জন্য অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে, কেউ কেউ নিজেকে একা মনে করতে পারে এবং একাকীত্ব ঘুচাতে কেউ একজন তার সাথে গল্প করুক এটা তারা চাইতে পারে।
আপনার মানসিক সুস্থতার যত্ন নিন
এখন দিন ছোট হওয়ার কারণে দিনরাতের বেশি সময় অন্ধকারে কাটাতে হয়। কিছু লোকের এক ধরনের বিষন্নতা থাকে যাকে বলা হয় সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার যা শীতের মাসগুলিতে তাদের মেজাজ এবং শক্তির মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। আপনি যদি মনে করেন ঋতুর পরিবর্তন আপনার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব বিস্তার করছে, তাহলে এ ব্যাপারে পরামর্শের জন্য আপনার জিপির সাথে যোগাযোগ করুন ।
আপনি কি বছরের শুরুতে কিছু নতুন কার্যক্রম বা শখের কাজের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথবা একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পরিকল্পনা তৈরি করেছেন? আপনি যদি নতুন বছরের ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা নাও করে থাকেন, তাহলে চিন্তার তেমন কোনো কারণ নেই। আপনি আপনার স্বাস্থের প্রতি মনোযোগ দিন । আপনি যা করতে পারেন তা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রেশ বাতাস, দিনের অলো এবং নিয়মিত ব্যায়াম আমাদের মন মেজাজ ভালো রাখতে পারে। মৃদু বাতাসে দ্রুত হাঁটা আমাদের শরীরকে সচল করে, রক্ত পাম্প করে এবং হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়। তবে যদি আপনার বাইরে বের হওয়া সম্ভব না হয়, আপনি অন্য ধরনের ব্যায়াম করার চেষ্টা করতে পারেন যা আপনার জন্য সহজ হয় । আপনি যদি বাড়ির ভিতরে বেশিরভাগ সসময় থাকেন বা বাইরের বেরুনোর পর শীতের কারণে সারা শরীর পোশাকে মুড়িয়ে রাখেন, তাহলে আপনার ভিটামিন ডি-এর অভাব দেখা দিতে পারে । এক্ষেত্রে আপনার ফার্মাসিস্ট শীতকালে আপনার ভিটামিন ডি-এর মাত্রা বাড়াতে পরিপূরক খাওয়ার সম্পর্কে পরামর্শ দিতে পারেন।
আপনি কিভাবে সহযোগিতা পেতে পারেন?
এনএইচএস এর অনেক সেবা রয়েছে । আপনি সুস্থবোধ না করলে এগুলো আপনাকে পরামর্শ দিতে পারে।
• আপনার স্থানীয় ফার্মেসী : ছোটখাটো অসুস্থতা, রোগের উপসর্গ অথবা আপনার নিয়মিত প্রেসক্রিপশন সম্পর্কে পরামর্শের জন্য স্থানীয় ফার্মেসি আপনাকে সহযোগিতা করতে পারে।
• আপনার স্থানীয় জিপি: ডাক্তার, নার্স ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের দ্বারা পরিচালিত আপনার স্থানীয় জিপি সার্জারি থেকে সহযোগিতা পেতে পারেন।
• জরুরী চিকিৎসা কেন্দ্র: এখানে আপনি কাটা, স্ট্রেন এবং ছোটখাটো পোড়াজনিত সম্যসায় সাহায্য পেতে পারেন ।
• ৯৯৯ অথবা অ্যাকসিডেন্ট এন্ড ইমার্জেন্সি (এএন্ডই) : এই বিভাগে আপনি জরুরী চিকিৎসাসেবা পাবেন। আপনার জীবন যদি হুমকির ঝুঁকিতে থাকে তাহলে ৯৯৯ কল করে সাহায্য নিতে পারেন। অথবা জরুরী ভিত্তিতে কারো সাহায্য নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে এ.এন্ড.ই বিভাগে ভর্তি হতে পারেন।
• 111.nhs.uk ভিজিট করুন অথবা111 নম্বরে কল করুন :
আপনার যদি কোনো জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, কিন্তু আপনি নিশ্চিত নন কী করবেন, কোথায় চিকিৎসা পাবেন-তাহলে 111.nhs.uk ওয়েবসাইট ভিজিট করুন অথবা111 নম্বরে কল করুন ।
• এনএইচএস অ্যাপ : আপনি আপনার ফোনে অথবা ট্যাবলেটে এই অ্যাপ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ভ্রমনের জন্য কোভিড পাস পেতে পারেন। আপনার সব হেলথ রেকর্ড চেক করতে পারবেন। তাছাড়া আপনার নিয়মিত প্রেসক্রিপশনগুলোও পুনরায় সাজাতে পারবেন ।
সঠিক মাধ্যম থেকে সাহায্য পাওয়া নিশ্চিত করে যে, আপনি একজন দক্ষ পেশাদারের সঙ্গে দ্রুত দেখা করতে পারছেন । যিনি আপনার যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যা পর্যালোচনা করে সঠিক চিকিৎসা প্রাপ্তিতে সহায়তা করতে পারবেন।
যেখানে আপনি আপনার চলমান স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে আপনার জিপির সাথে কথা বলতে পারবেন । প্রতিটি মানুষের জিপি সার্ভিস থেকে বিনামুল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে । এমনকি যদি তাঁর ঠিকানা অথবা ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাসের প্রমাণাদী, আইডি অথবা এনএইচএস নাম্বার নাও থাকে । আপনি যে ঠিকানায় নিয়মিত থাকেন সেখান থেকে যদি দুরে অন্য কোথাও থাকেন অথবা আপনি যদি কোনো জিপিতে ভর্তি না হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার কাছাকাছি যে কোনো জিপিতে ভর্তি হতে পারবেন।
‘আমরা এখানে আপনার সেবার জন্যই আছি’
–ডক্টর তেহসিন খান
ডক্টর তেহসিন খান বলেন, “আপনার যখনই কোনো স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিবে এবং এ ব্যাপারে পরামর্শ এবং সহায়তার প্রয়োজন হবে তখন যেকোনো ফার্মাসিস্ট অথবা স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, আমরা এখানে আপনার সেবার জন্যই আছি।”
ডাঃ তেহসিন খান লন্ডনের একজন জিপি এবং কোভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচির একজন সিনিয়র ক্লিনিক্যাল উপদেষ্টা । তিনি কোভিড-১৯ সংক্রমণের সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় কমিউনিটির মানুষকে টিকা প্রদানের কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি টিকা গ্রহনের সুবিধাগুলি তুলে ধরে মানুষকে টিকা গ্রহণে আগ্রহী করে তুলেন।
You can book your COVID-19 vaccine by scanning the QR code, or book your COVID-19 or flu vaccine by calling 119 for free or online at www.nhs.uk/wintervaccinations.

