‘বড়লেখা-জুড়ী’ আসনে বিএনপির মনোনয়ন যুদ্ধে ১৩ জন, কে পাচ্ছেন দলীয় টিকিট?
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ নভেম্বর ২০১৮
দেলোয়ার হোসাইন, সিলেট থেকে (লন্ডন, ২০ নভেম্বর): একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে আওয়ামী লীগ ১, বিএনপি ১৩, জাতীয় পার্টি ২, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ১ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে জমা দিয়েছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে আর কোনো দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী না থাকায় একক প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় সাংসদ ও সরকার দলীয় হুইপ মো. শাহাব উদ্দিনের মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত।
অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে ১৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ফলে ভোটের লড়াইয়ে নামার আগে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাথে লড়াইয়ে নেমেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তবে এ আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী ও মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহ সভাপতি শিল্পপতি নাসির উদ্দিন মিঠু বেশ আলোচনায় রয়েছেন। এই দু’জনের মধ্যে একজন দলীয় মনোনয়ন পাবেন এমাটাই ধারণা তৃণমূল নেতাকর্মীর।
এ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন- সাবেক প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহ সভাপতি নাসির উদ্দিন মিঠু, কাতার বিএনপির সদস্য সচিব ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শরিফুল হক সাজু, বড়লেখা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাফিজ, সহ সভাপতি আমেরিকা প্রবাসী দারাদ আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান খসরু, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুস সহিদ খান, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র প্রভাষক ফখরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও বর্তমান মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রাহেনা বেগম হাসনা, বড়লেখা পৌর বিএনপির সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম, জুড়ি উপজেলা বিএনপির সভাপতি দেওয়ান আইনুল হক মিনু, জুড়ি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান আসকর ও কাতার প্রবাসী বিএনপি নেতা লোকমান আহমদ।
এ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী। তিনি জাতীয় পার্টি ও বিএনপি থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন । তাঁর সময়ে এলাকায় শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎসহ ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। যদিও ২০০৮ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর এলাকায় অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন বলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ আছে। কিন্তু এ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে তাঁর কোনো বিকল্প নেই। দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে শতভাগ আশাবাদী এবাদুর রহমান চৌধুরী সাপ্তাহিক দেশ’কে বলেন, এ আসন থেকে আমি চারবার এমপি নির্বাচিত হয়েছি, প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছি। এ সময় বড়লেখা-জুড়ীর অনেক উন্নয়ন করেছি। মনোনয়ন পেলে এ আসন অবশ্যই দলকে উপহার দিতে পারবো।
অন্যদিকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ও বিশিষ্ট শিল্পপতি নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু দলীয় মনোনয়ন পেতে বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশে তৃণমূলে দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। দলের দুর্দিন ও মামলা মোকদ্দমায় সহযোগিতাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আর্থিক সাহায্য নিয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মনোনয়ন প্রাপ্তির ব্যাপারে তিনিও আশাবাদী। তবে মনোনয়ন না পেলেও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন বলে সাপ্তাহিক দেশ’কে জানান তিনি।
এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী কাতার বিএনপির সদস্য সচিব ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক শরীফুল হক সাজু। তৃণমূল থেকে উঠে আসা শরীফুল হক সাজু দলীয় নেতাকর্মীর দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়ে দলকে সুসংগঠিত করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। এ জন্য তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সমর্থনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি সাপ্তাহিক দেশ’কে জানান, বড়লেখা-জুড়ী প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা। এ দুই উপজেলার প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন। প্রবাসীদের পক্ষে কথা বলা একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে তিনি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ সংসদ সদস্য হয়েছে, কিন্তু প্রবাসীদের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের কথা বলার মতো কেউ সংসদে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। পাশাপাশি আমি মনে করি, প্রবাসে থেকে মনোনয়ন পেলে বিশ্বের অন্যান্য দেশে যারা রাজনীতি চর্চা করেন, তারা উৎসাহী হবেন। তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে আমার নিবিড় যোগাযোগ আছে বলেই আমি প্রবাসে থেকেও মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। তবে দল যাকে মনোনয়ন দেবে তাঁর পক্ষে কাজ করবো।
দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বড়লেখা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাফিজ বলেন, দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আমি আশাবাদী । তবে দল যদি আমাকে মনোনয়ন না দেয় তাহলে দলীয় নেতাকর্মীর দুর্দিনে যিনি পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন তাকে যেন মনোনয়ন দেয়। মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহ সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু গত দশ বছর থেকে দলসহ দলীয় নেতাকর্মীদের সাহায্য সহযোগিতা করে আসছেন। আশা করি দল তাকে মূল্যায়ন করবে।
ওয়ান এলেভেন-এর প্রেক্ষাপটে তৎকালিন সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গণতন্ত্র হত্যা মামলার বাদী ও কেন্দ্রীয় জাসাসের সহ সাধারণ সম্পাদক উপজেলা বিএনপির সহ সভাপতি দারাদ আহমদ দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পোস্টার, ফেস্টুন টানিয়েছেন। দারাদ আহমেদ বলেন, দলের জন্য কাজ করছি। দল যে সিদ্ধান্ত নেবে তা ভালোর জন্যই নেবে।
বিএনপির দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বড়লেখা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান খসরু সাপ্তাহিক দেশ’কে বলেন, দল দশ বছর ক্ষমতার বাইরে । কর্মীরা মামলা-হামলায় জর্জরিত । দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি দলের জন্য কাজ করে যাবো। কিংবা দলের দুঃসময়ে যিনি কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, দলকে সুসংগঠিত করতে কাজ করেছেন, এমন কাউকে কেন্দ্র মনোনয়ন দেয়, তবে আমরা তাঁর হয়েই কাজ করবো।
উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুস সহিদ খান সাপ্তাহিক দেশ’কে বলেন, দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আমি আশাবাদী। তবে দল থেকে আমি যদি মনোনয়ন না পাই তাহলে দলের দুঃসময়ের কান্ডারী নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু দলীয় মনোনয়ন পাবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। কেননা, সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরীর অবদান অস্বীকার করা যাবে না, তবে গত দশ বছর থেকে তিনি জনবিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু দলীয় কর্মকাণ্ডে সবসময় নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছেন । তাই মৌলভীবাজার-১ আসনে তিনি ধানের শীষের প্রতীকের দাবিদার।
মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বড়লেখা পৌরসভার সাবেক মেয়র প্রভাষক ফখরুল ইসলাম সাপ্তাহিক দেশ’কে বলেন, দলীয় মনোনয়ন নিয়ে আমি আশাবাদী । তবে আমি যদি মনোনয়ন না পাই তাহলে চাইবো সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরীকে যেন মনোনয়ন দেওয়া হয় । বড়লেখা-জুড়ীর উন্নয়নে এবাদুর রহমান চৌধুরীর কোনো বিকল্প নেই।
এ আসনে একমাত্র নারী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও বর্তমান বড়লেখা উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রাহেনা বেগম হাসনা সাপ্তাহিক দেশ’কে বলেন, দল যদি তৃণমূল থেকে চিন্তা করে তাহলে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আমি আশাবাদী। কেননা আমি উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিপুল ভোটে দু’বার নির্বাচিত হয়েছি। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবো, আর যদি অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয় তাহলে তাঁর হয়ে কাজ করবো।
এ আসনে জাতীয় পার্টি (জাপা) থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী জাতীয় পার্টির কেদ্রীয় সদস্য আহমেদ রিয়াজ ও উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আইনজীবী আফজাল হোসেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ঢাকা মহানগরীর শেরে বাংলা নগর থানা জামায়াতের সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় শিবিরের সাবেক অর্থ সম্পাদক মাওলানা আমিনুল ইসলাম।
এছাড়া চরমোনাই পীরের সংগঠন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জুড়ী শাখার সভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিন একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।
উল্লেখ্য, মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী ২টি উপজেলা (বড়লেখা-জুড়ী), ১টি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-১ আসনে দুই উপজেলা মিলিয়ে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৬৫ হাজার ৬১৪ জন।
প্রসঙ্গত, পুনঃতফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ২৮ নভেম্বর। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ২ ডিসেম্বর। ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে। আর ভোটগ্রহণ ৩০ ডিসেম্বর।

