মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে আ’লীগের প্রার্থী শাহাব উদ্দিন, বিএনপি ও জাপায় একাধিক
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ অক্টোবর ২০১৮
দেলোয়ার হোসাইন ও তপন কুমার দাস:
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসন ঘিরে সর্বত্রই নির্বাচনী উত্তাপ। জেলার সীমান্তবর্তী দুটি উপজেলা (বড়লেখা-জুড়ী), একটি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-১ আসন। এ আসনের দুই উপজেলা মিলিয়ে ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৬৫ হাজার ৬১৪ জন।
নৌকার ঘাঁটি খ্যাত এ আসনে আ’লীগের ভোট ব্যাংক ১৯ টি চা বাগানের চা শ্রমিক ভোটার। স্বাধীনতার পর থেকে বেশিরভাগ সময়ই আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। এবারও আসনটি ধরে রাখতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। একক প্রার্থী নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি দখল করতে মরিয়া বিএনপি।
সক্রিয় আছে জাতীয় পার্টি ও ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীও। কোনো কারণে জোট থেকে মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তাঁরা।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর ৮ জন প্রার্থী প্রস্তুতি নিচ্ছেন নির্বাচনের।
এ আসনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় হুইপ ও বর্তমান সাংসদ মো. শাহাব উদ্দিন। বিএনপি থেকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় বিএনপির অন্যতম নেতা অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী ছাড়াও মনোনয়ন প্রত্যাশী আছেন তিনজন। এরা হচ্ছেন- কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও কাতার বিএনপির সদস্য সচিব শরীফুল হক সাজু, জেলা বিএনপির সহ সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক বড়লেখা পৌর মেয়র প্রভাষক ফখরুল ইসলাম।
বড় এ দু’দলের পাশাপাশি এখানে মনোনয়ন পেতে দৌঁড়ঝাপ করছেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আহমেদ রিয়াজ ও বড়লেখা উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট আফজল হোসেন। এছাড়া এই আসনে ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াত ইসলামী দল ও জোটগতভাবে এ আসনে মনোনয়ন পেতে চায়। তাদের প্রার্থী হচ্ছেন- ঢাকা মহানগরীর শেরে বাংলা নগর থানা জামায়াতের সেক্রেটারি ও সাবেক কেন্দ্রীয় শিবির নেতা মাওলানা আমিনুল ইসলাম।
মৌলভীবাজার-১ আসনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী আহমদ রিয়াজের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাংসদ নির্বাচিত হন শাহাব উদ্দিন। এরপর তিনি জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় হুইপ মনোনীত হন। এছাড়া পরবর্তীতে শাহাব উদ্দিন বড়লেখা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এর আগে ২০০৮ ও ১৯৯৬ সালে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন শাহাব উদ্দিন।
আওয়ামী লীগ:
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় হুইপ ও স্থানীয় সাংসদ শাহাব উদ্দিন এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ, দলীয় কর্মকান্ড ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করছেন। গত ৪ সেপ্টেম্বর জুড়ী ও বড়লেখায় নবনির্মিত দুইটি ৫০ শয্যার পৃথক হাসপাতাল উদ্বোধনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত পৃথক সুধী সমাবেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ১৪দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম এমপি শাহাব উদ্দিনকে এ আসনের একক প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেওয়ায় তিনি এখন ফুরফুরে মেজাজে প্রচারণা চালাচ্ছেন। নেতাকর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ করছেন নির্বাচনী এলাকার একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। অক্টোবর মাসে করেছেন একাধিক দলীয় বর্ধিত সভা।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী হুইপ মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছি। নির্বাচনী এলাকা ছাড়াও কুলাউড়া ও বিয়ানীবাজারের জনসাধারণের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবী কুলাউড়া-শাহবাজপুর পরিত্যক্ত রেললাইন চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। রেল লাইনে কাজ চলছে। দু’টি কলেজ ও দু’টি উচ্চ বিদ্যালয় সরকারি করেছি। নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার কার্যক্রম চলছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন করে দিয়েছি। তা অতীতে কোন সময় হয়নি। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রাখতে জনগণ আমাকে আবারও বিজয়ী করবে।’
এ বিষয়ে বড়লেখা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী বলেন, ‘গত দশ বছরে হুইপ মহোদয় (শাহাব উদ্দিন) এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে দল শক্তিশালী ও গোছানো অবস্থায় আছে। দলগতভাবে আমরা খুবই শক্তিশালী। দলে অন্তর্দ্বন্দ্ব নেই। এলাকায় উন্নয়নে মানুষ খুশি। আমাদের একক প্রার্থী হুইপ শাহাব উদ্দিন। তাঁকে বিজয়ী করতে আমরা ঐক্যবদ্ধ।’
বিএনপি:
এ আসনে বিএনপির ৪জন প্রার্থী নির্বাচনী প্রস্তুতি চালাচ্ছেন। সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে সন্দেহ করছি না। আমি ৭ বার এই আসনে নির্বাচন করেছি। ৪ বার এমপি হয়েছি। আমার সময়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন উন্নয়ন মানুষ ভুলেনি। মনোনয়ন পেলে এ আসন অবশ্যই দলকে উপহার দিতে পারব।’
কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও কাতার বিএনপির সদস্য সচিব শরীফুল হক সাজু মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-আমেরিকায় বিএনপির জনমত সৃষ্টি ও দলকে সু-সংঘটিত করার কাজে জড়িত রয়েছেন। হামলা মামলার শিকার নেতাকর্মীদের আর্থিক সহযোগিতা করছেন। তিনি বলেন, ‘একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জননেতা এবাদুর রহমান চৌধুরী। তিনি বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ। আমি ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হতে আগ্রহী। এরপরও দল যদি তৃণমূলের অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়, আমি তাঁর পক্ষে কাজ করব। তবে নিছক টাকার জোরে কাউকে মনোনয়ন দিলে ত্যাগী কর্মীরা কাজের আগ্রহ হারাবে।’
মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহসভাপতি নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু ঢাকাস্থ জালালাবাদ এসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি ও জুড়ী উপজেলার আপ্তাব আমেনা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি বলেন, ‘দলের উচ্চ পর্যায়ের সবুজ সংকেত পেয়ে আমি তৃণমূল বিএনপির সাথে কাজ করছি। নেতা-কর্মীদের দুর্দিনে পাশে ছিলাম। জেলা ও কেন্দ্র এ বিষয়ে অবগত আছেন। সে জন্য তৃণমূল বিএনপির সমর্থন আছে আমার প্রতি। দলীয়ভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধ। দল যদি অন্য কাউকে পার্থী করে। তাতে কোনো দ্বি-মত থাকবে না। আমরা তাঁর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব। তবে আমার নেত্রী জেলে। সে ক্ষেত্রে নেত্রীর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে যাবার সম্ভাবনা নেই।’
মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক বড়লেখা পৌরসভার মেয়র প্রভাষক ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘যদি কোনো কারণে সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরী নির্বাচন না করেন। তাহলে আমি মনোনয়ন চাইব। সে লক্ষ্যে কাজ করছি।’
বড়লেখা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান খছরু বলেন, ‘দল দশ বছর ক্ষমতার বাইরে। কর্মীরা মামলা-হামলায় জর্জরিত। এরপরও দল সাংগঠনিক দিক থেকে ঐক্যবদ্ধ, মজবুত ও গোছানো আছে। বিএনপি সরকারের সময়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের নেতৃত্বে এ উপজেলার উন্নয়ন তৃণমূলের মানুষ ভুলেনি। বিশেষ করে শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতের উন্নয়ন। আমদের মুরব্বি সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরীও উন্নয়নে অবদান অস্বীকার করা যাবে না। বর্তমানে তিনি অসুস্থ। এলাকার রাজনীতির সাথে যোগাযোগ কম। সে জন্য আমাদের তরুণ নেতা প্রয়োজন। যাকে নিয়ে দুর্গম এলাকার ঘরে ঘরে যাওয়া যাবে। তবে দল যাকে দেবে তাঁর হয়েই কাজ করব আমরা। তবে দল যদি মনোনয়ন পরিবর্তন করে সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরী কিংবা মনোনয়ন প্রত্যাশি কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা শরীফুল হক সাজুকে দেন আমরা তাঁর পক্ষে কাজ করব। দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আমার নেত্রী জেলে। দল আদৌ নির্বাচনে যাবে কি না এই বিষয়ে আমরা সন্দিহান। নেত্রীর মুক্তি ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা হলে দল যাকে দেবে তাঁর হয়েই কাজ করব আমরা।’
জাতীয় পার্টি:
জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কাতার প্রবাসী আহমেদ রিয়াজ ও বড়লেখা উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট আফজল হোসেন। এই দুইজনই এলাকায় গণসংযোগ করছেন।
আহমেদ রিয়াজ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। আহমেদ রিয়াজ বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন থেকে দলের জন্য এলাকায় কাজ করছি। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেই মানুষ আমাকে ভোট দেবে। একটি বড়দলে প্রার্থী অনেক থাকেন। মনোনয়ন চাইতেই পারেন। দলের প্রয়োজনে দল যাকে দেবে তাঁর হয়েই কাজ করব।’
বড়লেখা উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট আফজল হোসেন বলেন, ‘দশ বছর থেকে দলের জন্য এলাকায় কাজ করছি। গণসংযোগ করছি। আমি বিশ্বাস করি বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে দল আমাকে মনোনয়ন দেবে।’
জামায়াত:
২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াত ইসলামী দল ও জোটগতভাবে মনোনয়ন পেতে চায়। কোনো কারণে জোট থেকে মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত। এ আসনে বড়লেখা উপজেলা ও পৌরসভার গত নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীরা বিএনপির প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পায়। জয়ী হওয়া আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা। যে কারণে জামায়াত-শিবিরের নেতকর্মীরা চাঙ্গা। সে লক্ষ্যে প্রস্তুতিও চলছে তাঁদের। এ আসনে তাঁদের প্রার্থী হচ্ছেন- ঢাকা মহানগরীর শেরে বাংলা নগর থানা জামায়াতের সেক্রেটারি ও সাবেক কেন্দ্রীয় শিবির নেতা মাওলানা আমিনুল ইসলাম।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘দলগতভাবে আমরা সিরিয়াস এ আসন নিয়ে। জোটগতভাবেও নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চলবে। এ আসনে আমাদের জনসমর্থন বেশি। দলীয়ভাবে এ প্লাস ক্যাটাগরির আসন এটি। নেতা-কর্মীদের উপর অনেক মামলা-হামলা হয়েছে। তারপরও তাঁরা মাঠে সক্রিয়। প্রচার কাজ চলছে। মনোনয়ন পেলে আমরা জয়ী হতে পারব বিশ্বাস করি। জোটের অনেক প্রার্থীও আছেন। পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে কতটুকু ছাড় দেওয়া যাবে। তবে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’

