টোয়েক ইস্যুতে আদালতের যুগান্তকারী রায় : যুক্তরাজ্যে বসেই আপীলের সুযোগ পাবে ভুক্তভোগীরা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৭
দেশ ডেস্ক : ইংরেজি দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা ‘টেস্ট অব ইংলিশ ফর ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশনস’ বা টোয়েক কেলেঙ্কারির ভুক্তভোগীদের যুক্তরাজ্যে থেকেই আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন আদালত। ইটিএস/টোয়েক কেসের একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছে কোর্ট অব আপীল, রয়েল কোর্ট অব জাস্টিস। গত ৫ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ৫০পৃষ্ঠা দীর্ঘ বিস্তারিত রায় প্রদান করেছে তিন বিচারকের একটি কোর্ট। লর্ড জাস্টিস আন্ডারহিল, লর্ড জাস্টিস ফ্লয়েড এবং আরইউন এই রায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রদান করেছেন। ইমিগ্রেশন বিশেজ্ঞরা ধারণা করেছেন এই রায়ের মাধ্যমে ইটিএস/টোয়েক ভুক্তভোগীরা ব্রিটেন থেকে আপীলের সুযোগ পাবে। এছাড়া ভুক্তভোগীদের অন্যান্য যথার্থ সমাধান পাওয়া যাবে এই রায়ে।
এ রায়ের ফলে টয়েক কেলেঙ্কারির ভুক্তভোগী হাজার হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী উপকৃত হবেন। বিশেষ করে ভুক্তভোগীদের যাঁরা এখনো যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন, তাঁরা নতুন করে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পাবেন। ২০১৪ সাল থেকে টোয়েক সনদধারী বিদেশি শিক্ষার্থীদের কোনো প্রকার আইনি আশ্রয়ের সুযোগ না দিয়ে গণহারে বিতাড়ন করে আসছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জানানো হয়েছিল আগে নিজ দেশে ফেরত যাও, তারপর আপিল করো। সরকারের এমন বিতর্কিত নীতিকে কোর্ট অব আপিল অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। বলেন, দেশে ফেরত যাওয়ার পর যদি বিদেশি শিক্ষার্থীরা আপিল করেন, তাহলে তাঁরা আদালতে হাজির হতে পারেন না, নিজেদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে পারেন না এবং তাঁদের কাছ থেকে বিচার প্রক্রিয়ায় উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর জবাব চাওয়ারও সুযোগ হয় না। ফলে এ নীতি অন্যায্য। ‘আপিল রাইট’ না থাকায় ভুক্তভোগী শত শত শিক্ষার্থী বিচার বিভাগীয় তদন্তের আবেদন করেন। এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোর্ট অব আপিল চারটি আবেদনকে নমুনা হিসেবে গ্রহণ করেন। চারজন আপীলকারীর সংযুক্ত টেস্ট কেইসের আপীলের রায়ে একজন বাংলাদেশী, একজন পাকিস্থানি ও দুই জন ভারতীয় রয়েছেন।
পূর্ব লন্ডনের স্বনামধন্য সলিসিটর ফার্ম ইউনিভার্সাল সলিসিটরস বাংলাদেশী আপীলকারীর পক্ষে কোর্টে প্রতিনিধিত্ব করেন। রায় স্টুডেন্টদের পক্ষে এলে ওই দিনই বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ইউনিভার্সাল সলিসিটরস। সংবাদ সম্মেলনে ইউনিভার্সাল সলিসিটরস এর পক্ষে রায়ের বিস্তারিত তুলে ধরেন ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম ও জাকারিয়া খান রনি। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ইউনিভার্সাল সলিসিটরসের আইনজীবীরা জানান, এই রায়ের মাধ্যমে ইটিএস/টোয়েক ভুক্তভোগীরা যে কোন অবস্থাতে ব্রিটেনে থেকেই এই মামলার অভিযোগের বিরুদ্ধে আপীলের সুযোগ পাবেন। সংবাদ সম্মেলন থেকে ইউনিভার্সাল সলিসিটরস এর পক্ষ থেকে ডিসেম্বর মাসব্যাপী ইটিএস/টোয়েক বিষয়ে ফ্রি কনসালটেমনের ঘোষণা দেয়া হয়।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিবিসিতে প্রচারিত ‘প্যানারমা’ অনুষ্ঠানে দেখানো হয়, ভিসার মেয়াদ বাড়াতে প্রয়োজনীয় ইংরেজি দক্ষতার প্রমাণ দিতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন। অন্তত তিনটি পরীক্ষা কেন্দ্রে একজনের পরীক্ষা আরেকজন দিয়ে টোয়েক সনদ অর্জনের চিত্র তুলে ধরা হয় ওই প্রতিবেদনে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এডুকেশন টেস্টিং সার্ভিস (ইটিএস) এই পরীক্ষার নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এমন ঘটনার পর তদন্ত শেষে ওই বছরের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর দাবি করে, অন্তত ৪৮ হাজার টোয়েক সনদ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। ইংরেজি দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে টয়েক সনদকে অযোগ্য ঘোষণা করে সরকার। এরপর যাঁরা ইতোমধ্যে টয়েক সনদ ব্যবহার করে ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছেন এবং ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছেন, তাঁদের সবাইকে গণহারে বিতাড়ন শুরু করে বৃটেন। অনেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবী, পারিবারিক ভিসা বা স্থায়ী হয়েছেন; কিন্তু অতীতে কোনো এক সময় টয়েক সনদ ব্যবহার করায় তাঁদের ভিসা বাতিল করে ফেরত পাঠানো হয়। হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীও এর শিকার হয়। আইনজীবীরা এই রায়কে যুগান্তকারী আখ্যা দিয়ে বলছেন, প্রত্যেক মানুষের যে আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার রয়েছে, রায়ে সেটিই প্রতিষ্ঠিত হলো।

