লন্ডনে অ্যাসিড-সন্ত্রাস বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ ডিসেম্বর ২০১৭
দেশ ডেস্ক: যুক্তরাজ্যে ডেলিভারি বয়ের কাজ করেন জাবেদ হোসেন নামের এক তরুণ। সম্প্রতি এক রাতে পূর্ব লন্ডনের হ্যাকনের একটি ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। এ সময় হঠাৎ দুই ব্যক্তি এসে তাঁর মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মারে। জাবেদ যখন অ্যাসিডের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, সেই মুহূর্তে তাঁর মোটরসাইকেলটি নিয়ে চম্পট দেয় ওই দুই দুর্বৃত্ত।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে রাজধানীতে প্রতিবছর এমন শত শত মানুষ অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে। এসব ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করছে দেশটির সরকার। অপরাধ দমনে জনগণকে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার জাবেদ হোসেন বলেন, ‘দুই দুর্বৃত্তের ছোড়া অ্যাসিডে আমার মুখ ঝলসে গেছে। আমার মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিতে চাইলে তারা অনেক উপায়েই তা করতে পারত। কেন তারা এ ক্ষেত্রে অস্ত্র হিসেবে অ্যাসিড বেছে নিল?’
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে এই অ্যাসিড-সন্ত্রাস বেড়েই চলেছে। অনেক নিরীহ মানুষ এর শিকার। গত বছর লন্ডনে ৪৫৪টি অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে। ২০১৫ সালে ২৬১ জন ও ২০১৪ সালে ১৬৬ জন এই অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছিল।
গত মাসে লন্ডনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় একজন পিৎজা ডেলিভারি বয় অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হন জাবেদের মতোই। জাবেদের চেয়ে তিনি অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
লন্ডনভিত্তিক দাতব্য সংস্থা অ্যাসিড সারভাইভারস ট্রাস্ট ইন্টারন্যাশনালের প্রধান জাফ শাহ বলেন, ‘অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার ব্যক্তিরা মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী; সাহসীও বটে। আর থেকে নিজেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করে তুলতে শক্তি ও সাহসের প্রয়োজন।’
জাফ শাহের অভিযোগ, অ্যাসিড কেনাবেচায় সুনির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি এ ধরনের কয়েকটি ঘটনার পর সরকারি কর্মকর্তারা একটু নড়েচড়ে বসেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাম্বার রাড অ্যাসিড-সন্ত্রাস দমনে গত অক্টোবরে নতুন একটি আইন পাস করার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবিত ওই আইনে বলা হয়েছে, কেউ যদি ক্ষতিকর পদার্থসহ ধরা পড়ে, তাকে এটি বহন করার যুক্তিযুক্ত কারণ প্রমাণ করতে হবে। কেউ যদি ঘর ও নর্দমা পরিষ্কারের জন্য সালফিউরিক অ্যাসিড কিনতে চান, তাহলেও তাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হবে।
পূর্ব লন্ডনের ইস্ট হামে বেশ কয়েকটি অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনার ঘটার পর যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির সদস্য ও আইনপ্রণেতা স্টিফেন টিমসও নড়েচড়ে বসেছেন। বেকটন এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়িতে বসে ছিলেন ঘনিষ্ঠ দুই আত্মীয়। এ সময় তাঁরা অ্যাসিড হামলায় গুরুতর আহত হন।
স্টিফেন টিমস বলেন, জনগণ এখন রাস্তায় চলাচলে ভয় পায়। এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশির ভাগ অপরাধীর বয়স ২০ বা কিশোর বয়সের। এসব অপরাধ দমনে পূর্ব লন্ডনের নিউহ্যাম এলাকার দোকানদারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যদি কোনো কারণে অ্যাসিড ক্রেতার আচরণ সন্দেহজনক মনে হয়, তাহলে দোকানদারকে তার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। প্রয়োজনে তার কাছে অ্যাসিড বিক্রি করা যাবে না।
এ বিষয়ে স্টিফেন টিমস বলেন, নিউহ্যামের এই উদ্যোগ ইতিবাচক। দোকানদারেরাও এতে খুশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি হ্যাকনে এলাকার পুলিশ রাস্তায় কয়েকজনকে আটক করে তাদের কাছে থাকা অ্যাসিড বাজেয়াপ্ত করেছে। তরুণদের হাতে প্লাস্টিকের বোতল দেখলেই কেন ও কী উদ্দেশ্যে তাঁরা তা বহন করছেন, এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে ওই এলাকার অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজকর্মীদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন হ্যাকনের পুলিশ কমান্ডার সিমন লরেন্স।
সিমন লরেন্স বলেন, এসব ঘটনা পুলিশের একার পক্ষে বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ কারণে পুরো সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন।
গত এপ্রিলে পূর্ব লন্ডনের একটি নৈশ ক্লাবে একসঙ্গে ২২ জন অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছিলেন। এ ঘটনায় ২৫ বছর বয়সী এক তরুণকে অভিযুক্ত করা হয়। এ প্রসঙ্গে সিমন লরেন্স বলেন, ওই ঘটনায় তাঁদের (অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার ব্যক্তি) শরীরের চামড়া গলে গেছে। অসহনীয় ব্যথায় তাঁরা কাতর। এতে কারও কারও ধ্বংসের পথে।

