১৮ বছর বয়সেই কাউন্সিলার হলেন শরীফা
প্রকাশিত হয়েছে : ২৩ নভেম্বর ২০১৭
এডিনবরা প্রতিনিধি: মাত্র ১৮ বছর বয়সে নর্থ ইস্ট ইংল্যান্ডে কাউন্সিলার নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত তরুণী শরিফা রহমান। গত ১৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ডারলিংটন বারা কাউন্সিলের উপ-নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসাবে ৪৪.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে রেডহল এবং লিংফিলড ওয়ার্ড থেকে তিনি বিজয়ী হন। ডালিংটন তথা নর্থ ইস্ট ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে তরুণ কাউন্সিলার হয়েছেন শরীফা। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী টোরি পার্টির জোনাথন ডালস্টন। অপর প্রতিদ্বন্দ্বীরা হলেন- লিবডেমের হ্যারি লংমুর (১১ ভোট), গ্রীণ পার্টির মাইকেল ম্যাকটিমনি (২০ ভোট) এবং প্রাক্তণ ইউকিপকর্মী স্বতন্ত্র প্রার্থী কেভিন ব্রাক (৪৬ ভোট)। গত অক্টোবর মাসে বারা কাউন্সিলের রেডহল এবং লিংফিলড ওয়ার্ডের কাউন্সিলার হ্যাজেলডিন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলে আসনটি শুন্য হয়ে পড়ে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর শরীফাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন স্থানীয় এমপি জেনি চাপম্যান ও এন্ড্রু গাইন। অন্যদিকে নিউক্যাসেলের সিটি কাউন্সিলের বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত কাউন্সিলার দিপু আহাদ বলেন ‘শুধু বাংলাদেশী কিংবা মুসলিম মহিলা হিসাবে নয় এই এলাকায় প্রথমবারের মতো একজন তরুণী হিসাবে কাউন্সিলার নির্বাচন হওয়াটা আমাদের সকলের জন্য গর্বের ব্যাপার।’
এই তরুণ বয়সে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার মূল কারণ কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে জানা যায় শরীফার অতীত অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের কাহিনী। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার প্রভাবে সমগ্র ইউরোপজুড়ে মুসলিম কমিউনিটির উপর বর্ণবাদী হামলা বেড়ে যায়। নর্থ ইস্ট ইংল্যান্ডের ডালিংটন শহরে হিজাব পরিহিত মহিলারা তখন মুসলিম বিদ্বেষী বর্ণবাদী হামলার শিকার হন। তিনি নিজে এবং তার পরিবারের সদস্যরা বর্ণবাদী হামলার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনা খুব কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেন শরীফা। তখন থেকেই সমাজে বিদ্যমান নানা বৈষম্যের প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। কলেজ পড়ুয়া শরীফার বয়স তখন মাত্র ১৬। কুইন এলিজাবেথ সিক্সথ ফর্ম কলেজের ‘এ’ লেভেলের ছাত্রী। তাঁর পছন্দের বিষয় ছিল আইন, রাজনীতি ও ভূগোল। কলেজ শেষ করেই শরীফা যোগ দেন লেবার পার্টিতে। সাথে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে বর্ণবাদ বিরোধী ক্যাম্পেইনে চালাতে গড়ে তোলেন একটি ইয়ুথ একশন গ্রুপ, প্রথমবারের মতো ডালিংটনে চালু করেন বর্ণবাদ বিরোধী সংগঠন ‘স্টেন্ড আপ টু রেসিজম’র স্থানীয় শাখা। বর্ণবাদ বিরোধী মিটিং, মিছিল ও প্রতিবাদে যোগ দিতে চষে বেড়িয়েছেন লন্ডন, নিউক্যাসেলসহ পুরো ইংল্যান্ড। লেবার পার্টির সদস্য হওয়ার সুবাধে একান্ত সাক্ষাতে মিলিত হয়েছেন, কথা বলেছেন, জেরেমী করবিন কিংবা ডায়ানা অ্যাবোট-দের মত শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাথে। দীর্ঘদিন যাবত ডার্লো ইয়াং লেবার গ্রুপের সেক্রেটারির হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন শরীফা। বর্র্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রাখার জন্য ২০১৬ সাথে ডার্লিংটন শহরের সম্মানসুচক পদক অনুষ্ঠানে শরীফা রহমানকে ‘ইয়াং সিটিজেন অব দ্যা ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করা হয়। অ্যাওয়ার্ড প্রদানকালে শরীফাকে ব্যতিক্রমী ইয়াং উইমেন এবং কমিউনিটি এক্টিভিস্ট হিসাবে উল্লেখ করা হয় ।
স্থানীয় এমপি জেনি চ্যাপম্যান এর সহযোগিতায় ডার্লিংটনে শরীফা সম্প্রতি চালু করেছেন একটি পিস ক্যাম্পেইন। যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, কমিউনিটির মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করা এবং বর্ণবাদের কুফল সম্পর্কে জনসচেনতা সৃষ্টি করা। স্থানীয় বিবিসি এবং পুলিশ বিভাগ এ কার্যক্রমে নিয়মিত সহায়তা করে যাচ্ছে। কয়েক মাস আগে প্রকাশিত ‘এ’ লেভেল পরীক্ষার ফলাফলে ঈর্ষণীয় সাফলতা পেয়েছেন শরীফা। কুইন এলিজাবেথ কলেজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, ইউনিভার্সিটি অব নিউক্যাসেলে পলিটিক্স বিষয়ে গ্রাজুয়েশন কোর্স শুরু করতে যাচ্ছেন শরীফা। এ লেভেল পাশ করার পর গ্যাপ ইয়ারে সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে যখন যুক্ত ছিলেন তখনই কাউন্সিলার প্রার্থী হওয়ার সুযোগটি আসে। উল্লেখ্য, শরীফার জন্ম ও বেড়ে ওঠা নর্থ ইস্টের ডার্লিংটন শহরে। বাবা লোকমান খানের দেশের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার বরমরা গ্রামে। ৭ ভাই বোনের মধ্যে শরীফা সবার ছোট।
কাউন্সিলার হিসাবে বিজয়ী হওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে, শরীফা বলেন, ‘আমার নিজের শহরের জন্য কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত। আমার জন্য এটা খুবই আনন্দের বিষয় যে, যেখানে আমি বেড়ে উঠেছি সেখানকার মানুষের জন্য কিছু করতে পারবো।’ শরীফা আরও বলেন, ‘আমাদের সমাজে রয়েছে চরম বৈষম্য এবং এর কুফল ভোগ করছে সাধারণ মানুষ, আমি প্রচণ্ডভাবে এটা বিশ্বাস করি যে, আমাদের সমাজে পরিবর্তন দরকার। আমাদের সবার কর্তব্য হল বৈষম্যরোধে একসাথে কাজ করে যাওয়া। মধ্যবিত্ত ও খেটে খাওয়া পরিবার বেড়েউঠায় আমি গর্ববোধ করছি। সবার মাঝে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবো বলে আমি আশাবাদী।’

