বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা : এসিড হামলা প্রতিরোধে আসছে কঠোর আইন
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ অক্টোবর ২০১৭
০ ২০১৫ সালে ঘটেছে ২৬১টি এসিড হামলা ০ ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫৮টি
দেশ রিপোর্ট: এসিড হামলা নিয়ে যখন কমিউনিটিতে চরম উদ্বেগ উৎকণ্ঠা তখনই এই গুরুতর অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিলেন বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আম্বার রাড। ১৮ বছরের কম বয়সীদের কাছে এসিড বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। তাছাড়া নাইফ-ক্রাইম বন্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানালেন মন্ত্রী। চলতি সপ্তাহে ম্যানচেস্টারে দলীয় সম্মেলনে এ ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আম্বার রাড।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সালফিউরিক এসিড বিক্রির পরিমাণ একেবারে সীমিত করে দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধের ব্যাপারে পুলিশকে আরও বাড়তি ক্ষমতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এসিড বিক্রিতে সরকারের পরিকল্পনার একটা সম্ভাব্য রূপরেখারও ইঙ্গিত দেন আম্বার রুড। এ সময় তিনি ছুরি বহনে নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করেন। ওই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আম্বার রুড বলেন, এসিড হামলা নিঃসন্দেহে একটা ঘৃণিত কাজ। আপনারা সবাই ক্ষতিগ্রস্তদের ছবি দেখেছেন। আক্রান্তরা কখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠতে পারেননা। এর সীমাহীন যন্ত্রণা ঘটনার শিকার ব্যক্তির জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, জনসাধারণের কাছে ব্যাপকভাবে স্যালফিউরিক এসিডের বিক্রি সীমিত করে দেওয়া।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। তবে বিক্রেতারা যদি এটা দেখাতে পারেন যে, এসিড বিক্রিতে তারা সব যুক্তিসঙ্গত সতর্কতা অবলম্বন করেছেন তাহলে তারা আইনের খড়গ থেকে রেহাই পেতে পারেন। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ১৮ বছরের কম বয়সীদের হাতে এসিড পৌঁছানো বা বহন করা কঠিন হয়ে পড়বে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরু থেকেই এসিড হামলা ও নাইফক্রাইম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। গত ২৫ জুলাই মঙ্গলবার বিকেলে বেথনাল গ্রীন পুলিশ স্টেশনের খুব কাছে রোমান রোডে এসিড জাতীয় পদার্থে আরো দুই বাঙালি কিশোর গুরুতর আহত হন।
এ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে স্থানীয় এক দোকানী বলেন, আমার দোকানে দুইজন বাঙালি কিশোর আসে ৭টার কিছুক্ষণ আগে। তারা এসে বলতে থাকে, আমরা এসিড আক্রান্ত হয়েছি, আমাদের শরীর পুড়ে যাচ্ছে, আমাদের পানি দাও। পরে তারা নিজেরাই শরীরে পানি ঢালতে থাকে। পরে আমি পুলিশ কল করলে ২০ মিনিটের মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, উভয় কিশোরের মুখ মারাত্মকভাবে ঝলসে গেছে। পুলিশ বলছে এসিড নয়, ব্লিজ জাতীয় কোনো পদার্থ হতে পারে। হামলাকারীদের ধরতে সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ।
এর আগে ১৩ জুলাই বৃহস্পতিবার নর্থ-ইস্ট লন্ডনে ৫ জনকে লক্ষ্য করে এসিড হামলা চালানো হয়। জুন মাসে পূর্ব লন্ডনের রাস্তায় গাড়ির জানালা দিয়ে এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বৃটিশ তরুণী রেশাম খান ও তার সহযাত্রী জামিল মুখতার। এপ্রিল মাসে শুধু ইস্ট লন্ডনে এসিড হামলায় অন্তত ২০ জন আক্রান্ত হয়েছেন বলে বিবিসি’র রিপোর্টে উলেখ করা হয়। বৃটেনের ন্যাশনাল পুলিশ চিফ কাউন্সিলের তথ্যে চলতি বছরে প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্য এবং ওয়েলসে পৃথকভাবে ৪০০টি এসিড হামলার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এসব হামলায় অভিযুক্তদের অধিকাংশই তরুণ। তাদের বয়স ১৮ এর মধ্যে।
এসিডে বদলে গেছে মুসা মিয়ার চেহারা
এসিড হামলায় ২৩ বছর বয়সী মুসা মিয়ার চেহারা বদলে গেছে। গত মার্চে টাওয়ার হ্যামলেটসের ইস্ট ইন্ডিয়া ডকে মুসা মিয়ার উপর এসিড নিক্ষেপ করা হয়। এসিড নিক্ষেপের সময় সঙ্গে তার এক বন্ধুও ছিলেন। এরপর প্রায় ৩ সপ্তাহের বেশি সময় তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। চ্যামসফোর্ড বার্ন ইউনিয়টে দুই দফা তাঁর স্কীনের অপারেশন করা হয়। প্রায় ১৫ শতাংশ ভিশন ক্ষমতা হারিয়েছে তার বাম চোখ। মুসা মিয়া জানান, এসিডে তার মুখের বাম পাশ ঝ¡লসে গিয়েছিল। তার চেহারা এমন হয়েছিল যে, তিনি নিজেকে নিজে দেখে ভয় পেতে পেতেন। এ জন্য হাসপাতালের রুমের সব গ্লাস কাপড় দিয়ে ডেকে রাখা হত, যাতে তিনি নিজের মুখে নিজে দেখতে না পারেন। এরপর প্রায় ৬ মাসের বেশি সময় তাকে ঘরে আটকে থাকতে হয়েছে। মুসা মিয়ার উপর এসিড নিক্ষেপের অভিযোগে ২০ বছর বয়সী তরুণ এবং ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে অভিযুক্ত করেছে পুলিশ। তাদেরকে গত এপ্রিল মাসে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে হাজির করা হয়। চলিত মাসে তাদেরকে স্নেয়ার্সব্রোক ক্রাউন কোর্টে হাজির করা হবে।
সরকারি হিসাবে, ২০১২ সালের পর থেকে ইংল্যান্ডে এসিড এবং এসিড জাতীয় হামলা দ্বিগুণ হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে এসিড হামলা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হিসাবে, ২০১৫ সালে লন্ডনে ২৬১টি এসিড হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত বছর এটা বেড়ে ৪৫৮-তে দাঁড়িয়েছে।

