গণভোটের পর বৃটেনের অর্থনৈতিক মার্কেটে স্থবিরতা : রেন্ট মার্কেটে ধ্বস
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭
০ ল্যাণ্ড লর্ডদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ০ খালি পড়ে আছে ঘর, ভাড়া যাচ্ছেনা ০ ভাড়া কমছে অস্বাভাবিক হারে ০ সুদের হার বৃদ্ধির খবরে উদ্বেগ
দেশ রিপোর্ট: ব্রেক্সিট প্রশ্নে গণভোটের পর বৃটেনের অর্থনৈতিক মার্কেটে স্থবিরতা বিরাজ করছে। গত বছরের ২৩ জুন গণভোটের পর পর বৃটিশ পাউণ্ডের মূল্যপতন ঘটে। পাউণ্ডের বিপরীতে টাকার রেইট নেমে আসে ১০২ টাকায়। কিন্তু শুধু কারেন্সি মার্কেটই নয়; ধ্বস নেমে এসেছে প্রোপার্টি মার্কেটেও। ল্যাণ্ড লর্ডরা ঘর ভাড়া দিতে পারছেন না। মাসের পর মাস খালি পড়ে আছে অনেক প্রোপার্টি। অনেক এস্টেট অ্যাজেন্ট রেন্ট গ্যারান্টি স্কীমের ঘর ভাড়া দিতে পারছেন না। নতুন টেনেন্টের কাছে আগের ভাড়ায় ঘর ভাড়া দিতে পারছেন না। ফলে ল্যান্ড লর্ড ও এস্টেট অ্যাজেন্টদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম অনিশ্চয়তা।
পূর্ব লন্ডনের রোমান রোডের রাইটলেইন প্রোপার্টির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ফারুক ফুয়াদ চৌধুরী সাপ্তাহিক দেশকে বলেন, তিনি দশ বছর ধরে এই ব্যবসায় আছেন। ল্যাণ্ড লর্ডদের ৩শ ঘর তাঁর ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। এসব ঘর কোনোদিনও ভাড়াটিয়াশূন্য থাকেনি। বিশেষ করে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস হচ্ছে রেন্টের জন্য পিক মৌসুম। ওই সময় ঘরের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ব্রেক্সিটের পর তিনি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখী হয়েছেন। এ বছর আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরেও তাঁর অধীনে থাকা প্রায় ১২টি ঘর খালি পড়ে আছে। এই ঘরগুলো তিনি রেন্ট গ্যারান্টি স্কীমের আওতায় ম্যানেজেমেন্টের জন্য নিয়েছিলেন কিন্তু এখন ভাড়াটে পাচ্ছেন না। নিজের পকেট থেকে ল্যাণ্ড লর্ডকে ভাড়া দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ভাড়াটিয়ারা অধিকাংশই ইউরোপিয়ান। ব্রেক্সিটের পর এখন আর ইউরোপিয়ানেরা তেমন আসছে না। সকলেই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। অনিশ্চয়তার কারণে ইতোমধ্যে অনেকেই ইউরোপ ফিরে গেছেন। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে অনেক শিক্ষার্থী ইউরোপ থেকে লন্ডনের বিভিন্ন ইউনিভার্সিতে পড়তে আসেন। সেপ্টেম্বরে তাদের সেশন শুরু হয়। কিন্তু চলতি সেপ্টেম্বরে ইউরোপিয়ান শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে কোনো ঘর কোনো দিনও ভাড়াটেশূন্য থাকেনি। হঠাত খালি হলে ২/১ একদিনের ভাড়া চলে যেতো। কিন্তু এখন সেপ্টেম্বর চলে যাচ্ছে অথচ ১২টি ঘর খালি পড়ে আছে। তিনি বলেন, ভাড়াটে পাওয়া গেলেও আগের মতো ভাড়া মিলছে না। আগে যেখানে তিন বেডরুমের একটি ঘরে কমপক্ষে ২ হাজার পাউন্ড ভাড়া পাওয়া যেতো এখন তা ১৮শ পাউন্ডেও ভাড়া যাচ্ছে না। ৪ বেড রুমের ঘর আগে কমপক্ষে ২২শ পাউন্ডে ভাড়া গেছে এখন বড়জোর ১৯শ পাউন্ড পাওয়া যাচ্ছে।
ফারুক চৌধুরী বলেন, ব্রেক্সিটের কারণে তিনি ব্যবসা ক্ষেত্রে মারাত“ক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের নাগরিকেরা গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন সুদূর প্রসারী লাভের আশায়। গণভোটের পর এক বছরেরও বেশি সময় চলে গেছে অথচ এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। উপরন্তু ব্রেক্সিট কার্যকর করা না করা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা অনিশ্চয়তা। কখন ব্রেক্সিট কার্যকর হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এভাবে কতদিন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলতে হবে। ব্রেক্সিট কার্যকর হলে বৃটেনের হয়তো লাভ হতে পারে। তবে তা খুব সহসা নয়। অনেক বছর লাগবে। তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী টোনি ব্লেয়ারসহ অনেকেই আরেকটি গণভোটের কথা বলছেন। তারা মনে করেন, নতুন করে গণভোট হলে বৃটেনের মানুষ বুঝে শোনে ভোট দেবেন। বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে তারা আর বেক্সিটের পক্ষে ভোট দেবে না। তাহলে আমরা ইউরোপের সাথে থেকে যেতে পারবো। এতে করে অর্থনৈতিক মার্কেটে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। ফারুক চৌধুরী বলেন, আরেকটি গণভোট আয়োজন সম্ভব কি-না জানিনা তবে ইউরোপ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তে আপাতত আমরা ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছি। তাই ব্রেক্সিট নিয়ে আমাদেরকে নতুন করে ভাবা উচিত।
রেন্ট মার্কেট নিয়ে সাপ্তাহিক দেশ এর সাথে কথা হয় পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রীনের বাসিন্দা ল্যাণ্ড লর্ড আব্দুল মালিক-এর সাথে। তিনি বলেন, হ্যাকনীর এডা হাউজে তাঁর ৫ বেড রুমের একটি ফ্লাট রয়েছে। গণভোটের পূর্ব পর্যন্ত তিনি মাসে ২৮শ পাউন্ড ভাড়া পেয়েছেন। কয়েকমাস আগে পুরনো ভাড়াটেরা চলে যাওয়ার পর ঘরটি খালি হয়ে যায়। গত জুন, জুলাই ও আগস্ট তিন মাসই ঘরটি খালি পড়েছিলো। অবশেষে চলতি সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ থেকে একটি এস্টেট এজেন্টের কাছে একশ পাউন্ড কমিয়ে ২৭শ পাউন্ডে ভাড়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, এস্টেট এজেন্টরা রেন্ট গ্যারান্টি স্কীমের আওতায় ঘর নিলেও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে চুক্তিকৃত ভাড়া পরিশোধ করতে পারছেন না। তিনি বলেন, এই অবস্থার উত্তরণ হওয়া উচিত। প্রোপার্টি মার্কেটে এই অনিশ্চয়তা দূর করতে ব্রেক্সিট কার্যকর করা উচিত অথবা আরো একটি গণভোটের মাধ্যমে ব্রেক্সিট থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। মানুষ কতদিন এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে। ঘর কেনাবেচা ও ভাড়া দেয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ওয়েবসাইট রাইটমুভ ঘেটে দেখা যায়, পূর্ব লন্ডনের রেডব্রিজ, গ্যান্টস হিল, নিউব্যারী পার্ক, ক্লেহল, বার্কিংসাইড, হেইনুলট, চ্যাডওয়েলহীথ, ডেগেনহ্যাম, বার্কিং এলাকায় ভাড়া দেয়ার জন্য অনেক ঘর মাসের পর মাস খালি পড়ে আছে। রাইডমুভ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেয়ার সময় প্রথমে যে ভাড়া চাওয়া হয় কয়েকমাস পর ২/৩শ কমিয়ে দিতে হয়। এরপরও ভাড়া যাচ্ছে না।
অনুরূপ প্রোপার্টি কেনা-বেচার বাজারেও এখন মন্দাভাব বিরাজ করছে। একসময় রাইভমুভ ওয়েবসাইটে বিক্রির জন্য একটি ঘরের বিজ্ঞাপন দেয়ার পর গাইড প্রাইসের (চাওয়া দাম) উপরে বিডিং করে কিনতে হতো। অসংখ্য ক্রেতা ঘর কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। ফলে গাইড প্রাইসের চেয়ে ঘরের দাম অনেকগুণ বেড়ে যেতো। কিন্তু এখন প্রোপার্টি মার্কেটে আগের সেই অবস্থা আর নেই। তাই গাইড প্রাইসের নিচে দরকষাকষি করে ঘর কিনছেন।
এদিকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সম্প্রতি বলেছে, নভেম্বরে তারা সুদের হার বৃদ্ধি করার কথা চিন্তা করছে। বর্তমান সুদের হার ০.২৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ০.৫০ শতাংশ করতে চায় ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। তাই প্রোপার্টি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাংকের সুদের হার বেড়ে গেলে প্রোপার্টি মার্কেটে আরো ধ্বস নেমে আসবে। কারণ বেশি সুদ দিয়ে অনেকেই মর্টগেজ করতে চাইবেন না। তাছাড়া সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘর মালিকদের মর্টগেজ রিপেমেন্ট বেড়ে যাবে। অন্যদিকে রেন্ট মার্কেটে ধ্বস নামার কারণে কাঙ্খিত ভাড়াও পাবেন না। এমতাবস্থায় রিপেমেন্ট পরিশোধ করতে না পারলে অনেককে ঘর হারাতে হতে পারে। সর্বোপরি প্রোপার্টি মার্কেটে নেমে আসতে পারে অস্থিরতা।


