লেবার লীডার জেরেমি করবিনের কাছে পিটিশন : জন বিগসকে মেয়র প্রার্থী না করার আহবান
প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ আগস্ট ২০১৭
দেশ রিপোর্ট: টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার পার্টির অভ্যন্তরে নানা অনিয়ম ও বর্তমান মেয়র জন বিগসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে লেবার লীডার জেরেমি করবিনের অফিসে পিটিশন দাখিল করা হয়েছে। ৩০ আগস্ট বুধবার দুপুরে পিটিশনটি দাখিল করেন লেবার নেতা ব্যবসায়ী সিরাজুল হক সিরাজ, সাবেক ডেপুটি লীডার রাজন উদ্দিন জালাল, সাবেক ডেপুটি লীডার আলা উদ্দিনসহ কয়েকজন লেবার নেতা।
পিটিশনে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে আগামী মেয়র নির্বাচনে জন বিগসের পরিবর্তে অন্য কাউকে প্রার্থী মনোনীত করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। জেরেমি করবিনের অফিসে পিটিশন জমা দেয়ার পর পার্লামেন্টের পোর্টকলিজ অফিসের সম্মুখে এলবি টিভিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে অভিযোগের ব্যাপারে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
টিভি সাক্ষাতকারে লেবার নেতা সিরাজুল হক বলেন, আজকে এখানে যারা এসেছেন তারাই টাওয়ার হ্যামলেটসে আমাদের অস্তিত্ব ঠিকিয়ে রাখার সংগ্রামে কাজ করেছেন। তারা লেবার পার্টিতে বাঙালিদের সম্পৃক্ততার ট্রাকচার গঠন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজন হলেও সত্য, গত ১৫ বছরে এই ট্রাকচার বিনষ্ট হয়ে গেছে। ষড়যন্ত্র ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই স্ট্রাকচার দখল করে নেয়া হয়েছে। এই দখলদারীর কারণেই হাজার হাজার বাংলাদেশী লেবার পার্টির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো। আমার মতো অনেকেই প্রটেস্ট ভোট হিসেবে লেবার পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন না দিয়ে অন্য প্রার্থীকে (সাবেক মেয়র লুতফুর রহমান) সমর্থন দিয়েছিলেন সাময়িকভাবে। কিন্তু এটা দীর্ঘস্থায়ী সিদ্ধান্ত ছিলো না।
আমাদের কমিউনিটিকে এগিয়ে নিতে হলে, পলিটিক্যাল এস্টাবলিশমেন্টের সাথে কাজ করতে হলে আমাদের মূলধারার রাজনীতির সাথে কাজ করতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে আসতে হবে। সে কারণেই বিগত মেয়র নির্বাচনে আমরা লেবার পার্টির প্রার্থীকে (জন বিগস) সমর্থন দিয়ে নির্বাচিত করি। যদিও জন বিগস তখন অনেকের কাছেই পছন্দের প্রার্থী ছিলেন না। কিন্তু আমরা বাধ্য হয়েই তাঁকে মেনে নিই। তখন আমাদের কোনো পছন্দ-অপছন্দ ছিলো না। জন বিগস অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে আমাদের কাছে অ্যাপিল করলেন। বললেন, তিনি সকলকে নিয়ে কাজ করবেন। কারণ অতীতে আমাদের কমিউনিটির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান নেয়ার রেকর্ড রয়েছে।
এখন এতো বড় নির্বাহী মেয়রের দায়িত্ব পেয়ে তিনি আনন্দে আত“হারা। তিনি স্বচ্ছ ট্রান্সপারেন্ট গভর্ণেন্স দিতে পারেননি। শুধু তাই নয়, আমাদের কমিউনিটির বিরুদ্ধে এমন কিছু পলিসি প্রয়োগ করছেন যা আমাদেরকে সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইয়ুথ সার্ভিসকে সম্পুর্ণভাবে ধংস করে দিচ্ছেন। আমাদের চিলড্রেন সার্ভিস ধ্বংস করে দিয়েছেন। অফস্টেডের সিরিয়াস রিপোর্ট আমাদের বিরুদ্ধে এসেছে। সর্বশেষে আমাদের কমিউনিটির বিরুদ্ধে হচ্ছে তো হচ্ছেই, সাধারণ শ্বেতাঙ্গ মানুষও তাঁর পলিসির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা চাই, টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার পার্টির সদস্য ও সমর্থকরা জেগে উঠুন এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একজন স্বচ্ছ,ভালো দক্ষ মেয়র নির্বাচিত করার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করুন। এরই অংশ হিসেবে জেরেমি করবিনের কাছে আমাদের আজকের পিটিশন। জেরেমি করবিন অত্যন্ত যোগ্য লীডার। তিনি কমিউনিটি কোহিশন বুঝেন। তিনি তরুণ প্রজন্মের সমস্যা উপলব্দি করতে পারেন। ওয়ার্কিং ক্লাস মানুষের কষ্টের কথা বুঝেন। আমরা চাই তিনি ও লেবার পার্টির নির্বাহী কমিটি এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন। আমাদের কমিউনিটির মানুষকে সর্বাবস্থায় বুলিং করা হচ্ছে। আমাদের আগে যেখানে ৩২জন বাঙালি লেবার কাউন্সিলার ছিলেন, এখন সেখানে মাত্র ৮জন আছেন। এ জন্য আপনার সকল সোচ্চার হোন। আমরা ব্যক্তিগত কিছু চাচ্ছি না। আমরা চাই, আমরা যে লেগ্যাসি রেখে গেছি আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেনো তা ধরে রাখে পারে। আমরা যে ইতিহাস গড়েছি তারা যেনো তা ধরে রাখে। এই টাওয়ার হ্যামলেটসকে প্রমোট করা, টাওয়ার হ্যামলেটসকে স্টাবলিশ করা-এটা আমাদের অবদান। কেউ একা করেনি। জন বিগস তখন ধারে কাছেও ছিলেন না। কিন্তু এখন তারা তৈরি করা একটি অথোরিটি পেয়ে তা ধংস করে দিচ্ছে। আমরা চাই সকল ঐক্যবদ্ধ হোন এবং এসব রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন।
সিরাজ হক আরো বলেন, আমাদের মুসলিম কমিউনিটির বিরুদ্ধে নেতিবাচক লেখালেখি হচ্ছে। টাওয়ার হ্যামলেটসে একটি খ্রিস্টান শিশুকে বাঙালি মুসলিম পরিবারে দত্তক (লালন পালনের জন্য) দেয়া হয়েছে। শিশুটিকে যারা নিয়েছেন তাদের দোষ নেই। এটা কাউন্সিলের অদক্ষতা। খ্রিস্টান বাচ্চাকে তারা কীভাবে মুসলিম পরিবারে দিয়েছেন। নিয়ম হচ্ছে, ফস্টারিং বা দত্তক নেয়ার জন্য পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড ভালোভাবে দেখতে হয়। কালচারাল ব্যাকগ্রাউন্ডকে প্রধান্য দিতে হয়। কিন্তু কাউন্সিল এই পলিসি উপেক্ষা করেছে। কারণ জন বিগসের এখন প্রশাসন দেখার সময় নেই। তিনি কীভাবে আবার মেয়র হবেন-তা নিয়েই ব্যস্ত। আমাদের সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে তাঁর কোনো মাথা ব্যথা নেই। আজকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গোটা মুসলিম কমিউনিটির দুর্নাম হচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনা থেকে এতো বড় ঘটনা ঘটেছে। আমার বিশ্বাস, মুসলিম কমিউনিটিকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য ইচ্ছা করেই এসব করা হয়েছে। শুধু এ ঘটনাই নয়, এর আগেও এসব করা হয়েছে।
সাবেক ডেপুটি লিডার আলা উদ্দিন বলেন, টাওয়ার হ্যামলেটসে নির্বাহী মেয়র পদ্ধতি কাজ করছে না। আমরা জানি, গত মেয়রের (লুতফুর রহমান) আমলে কী ঘটেছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিলো বর্তমান মেয়র জনগণকে সার্ভিস দিবেন। কিন্তু তিনি সম্পুর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। তার পলিসির কারণে বাংলাদেশী কমিউনিটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি দত্তক শিশুকে নিয়ে আদালতের রায়ের প্রসঙ্গে বলেন, আজ (বুধবার) হাইকোর্ট রায় দিয়েছে, খ্রিস্টান ওই শিশুকে অবশ্যই মুসলিম বাঙালি পরিবার থেকে সরিয়ে নিতে হবে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এই খ্রিস্টান শিশুকে কেন মুসলিম বাঙালি পরিবারে পাঠানো হয়েছিলো। কে, কোন যুক্তিতে পাঠিয়েছিলেন। বর্তমান প্রশাসনের অদক্ষতার কারণেই এসব ঘটছে। এ জন্যই আমরা জেরেমি করবিনের কাছে পিটিশন দাখিল করেছি। জন বিগস কীভাবে আবারও মেয়র প্রার্থী মনোনীত হলেন তা তদন্তের জন্য আমরা অনুরোধ করছি। আমরা মনে করি, জন বিগস প্রার্থী থাকলে লেবার পার্টি আগামী মেয়র নির্বাচনে হারবে।
উল্লেখ্য, পিটিশনের ব্যাপারে নির্বাহী মেয়র জন বিগসের অফিস থেকে ৩০ আগস্ট বুধবার রাত পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে আগামী সপ্তাহে প্রকাশ করা হবে।

