সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায় : রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ আগস্ট ২০১৭
০ আওয়ামী লীগ নেতাদের দৌড়ঝাপ
০ কী আছে প্রধান বিচারপতির ভাগ্যে?
দেশ রিপোর্ট: বাংলাদেশে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার পর থেকেই আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রায় নিয়ে কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রী পরিষদ বৈঠকে রায়ের ব্যাপারে মন্ত্রীদের পরামর্শ চেয়েছেন। এরপর রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সাথে সাক্ষাৎ করে রায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইতোপূর্বে খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম বিচারপতির পদত্যাগ দাবী করেছেন। আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু বলেছেন, শেখ মুজিব না হলে ‘ছিঁচকে উকিলরা’ বিচবারপতি, প্রধান বিচারপতি হতে পারতেন না। আওয়ামী লীগের প্রকাশনা সম্পাদক হাসান মাহমুদ বলেছেন, বিচারপতি ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষনে সংবিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে তাই সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। এভাবেই প্রতিদিন প্রধান বিচারপতিকে কঠিন বক্তব্য শোনতে হচ্ছে। তাই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, প্রধান বিচারপতি কি শেষ পর্যন্ত তাঁর অবস্থানে অবিচল থাকতে পারবেন। চাপের মুখে তাঁবে সরে যেতে হবেনা তো।
এদিকে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে বিএনপি কিছুটা আশার আলো দেখছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিরোধী জোটের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির জন্মকেই অস্বীকার করা হয়েছে এই রায়ে। স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের পর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশে কোন গণতন্ত্র ছিল না। এই দীর্ঘ সময়ে দুই সামরিক শাসক আমলে দেশকে ‘বানানা রিপাবলিকে’ পরিণত করেছিল। ১৯৯০ সালের পর দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। এই রায়ে কিন্তু একবারও বলা হয়নি, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে গঠিত সরকার দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়েছিল। কোথাও বলা হয়নি বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু হওয়ার পরই কিন্তু শেখ মুজিব কর্তৃক বিলুপ্ত ঘোষিত আওয়ামী লীগ পুনরায় জন্ম নেওয়ার সুযোগ পায়। তারপরও বিরোধী জোটের নেতারা এই রায়কে ঐতিহাসিক দলীল হিসাবে কেন আখ্যায়িত করছেন, সেটা এখনো বোধগম্য নয়।
এদিকে আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ নেতা ও সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন আপিল বিভাগের বাকী ছয়জন বিচারপতি রায়ের পর্যবেক্ষনের সাথে একমত হননি। এটা আওয়ামী লীগের সাধারণ কোন নেতা বললে বেশি গুরুত্ব পেত না। ফজলে নূর তাপস সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। তিনি আওয়ামী আইনজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক। নিশ্চয়ই আপিল বিভাগের বাকী ছয় বিচারপতির সাথে তাঁর কথা হয়েছে। কথা না বলে তিনি জোর দিয়ে এটা বলতে পারতেন না। সুতরাং, বুঝাই যাচ্ছে বাকি ছয়জনকে দিয়ে রায়ের পর্যবেক্ষনের বিরোধীতা করানো হতে পারে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যে তাঁর ৬ সহকর্মীর তোপের মুখে রয়েছেন সেটাও ফজলে নূর তাপসের বক্তব্যে স্পষ্ট।
এদিকে ১৫ আগস্ট শোক দিবস উপলক্ষে পিজি হাসপাতালের ডাক্তারদের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞা। ওই অনুষ্ঠানে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের তদন্ত নাকি সঠিকভাবে হয়নি। সঠিক তদন্ত হলে আরও রাগব বোয়ালরা ধরা পড়তেন। কিন্তু সঠিক তদন্তের অভাবে রাগব বোয়ালদের ধরা যায়নি। তিনি এই বক্তব্যের মাধ্যমে রাগব বোয়াল হিসাবে কার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন তা এখনো স্পষ্ট নয়? রায় নিয়ে বিতর্কের মাঝে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে সরকারি বাসায় নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানালেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জন্য বিদ্যমান আচরণবিধি লঙ্ঘন করেই এই নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রায় নিয়ে বিতর্কে প্রধান বিচারপতি নিজে যখন আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন তখন বুঝাই যায় তাঁর মনোবল কতটা দুর্বল।
অপরদিকে একই অনুষ্ঠানে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞা যে বক্তব্য রেখেছেন, সেটা দলীয় নেতাদেরও হার মানায়। তিনি বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানেই তিনি বিচারপতি হতে পেরেছেন। এখন আপিল বিভাগের বিচারপতি হয়েছেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগের অবস্থান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে অবহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বুধবার রাতে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশে চলমান বন্যা পরিস্থিতি ছাড়াও ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হয়। বৈঠকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আগেই সেখানে উপস্থিত হন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। প্রধানমন্ত্রীর পর বঙ্গভবনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যান। রাত পৌনে ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ত্যাগ করে। পরে রাত সোয়া ১০টার দিকে বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি এবং ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ভবনে জঙ্গি হামলার যে চক্রান্ত হয়েছিল সেটা নিয়ে আলোচনা করেন তারা। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রায়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, আমরা কথা বলেছি।’ রাষ্ট্র প্রধান ও সরকার প্রধানের এই আলোচনায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি-না একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কোনো সিদ্ধান্তে আমরা পৌঁছাতে পারিনি। আলোচনা আরো হবে।’ রাষ্ট্রপতি কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সেটা তো বলা যাবে না।’
কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন- জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, এখনই সবকিছু বলা যাবে না। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। এখনো কারো সঙ্গেই আলোচনা শেষ হয়নি। আমরা রাষ্ট্রপতিকে দলীয় ও সরকারের অবস্থান ব্যাখা করেছি। আলোচনা শেষ হয়নি, আরো আলোচনা করতে হবে। আপনি কী আবার প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করবেন? জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, দেখা করতে যেতেও পারি। এটা হাইট করার কী আছে? ওপেন সিক্রেট। আমি কয়েকদিন আগে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। পরে আমি তো অস্বীকার করিনি। আবার দেখা করতে গেলে আপনারা জানবেন। খুব শিগগিরই কী ষোড়শ সংশোধনীর রিভিউ করা হবে- জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। পরে জানাবো।
প্রসঙ্গত, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠকের একদিন পর গত সোমবার বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন ওবায়দুল কাদের। রায় নিয়ে আওয়ামী লীগের ‘প্রকৃত’ অবস্থান জানাতে তিনি সেদিন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের যে পরিবর্তন ষোড়শ সংশোধনীতে আনা হয়েছিল, তা অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া রায় গত ১ আগস্ট প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি দেশের রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি, সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তাতে ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটাক্ষ ও অবমূল্যায়ন করা হয়েছে’ অভিযোগ তুলে রায়ে সংক্ষুব্ধ সরকারি দল কড়া সমালোচনা করছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রায়ের পর্যবেক্ষণের ‘আপত্তিকর’ মন্তব্য ‘এক্সপাঞ্জ’ (বাদ) দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক নজিরবিহীন: ফখরুল
আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে জাতি উদ্বিগ্ন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, সেই রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হয়েছে। যেটা হওয়ার কথা নয়, এটা নজিরবিহীন। তাই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ নিঃসন্দেহে সমগ্র জাতিকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
তিনি গত ১৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আবদুস সালাম তালুকদার স্মৃতি সংসদ পরিষদের এক আলোচনা ও দোয়া অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। বিএনপির মহাসচিব বলেন, শুধু তা-ই নয়, সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, নৈশভোজ করেছেন। সরকারের মন্ত্রী-এমপি এবং আওয়ামী লীগের পাতি নেতারাও প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা সুপ্রিম কোর্ট সম্পর্কে যেভাবে মন্তব্য করছেন, তা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় চলতে পারে না।

